ট্রাম্পের হুমকির মুখে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ: আইআরজিসির কড়া তদারকিতে পার হলো ২৬ জাহাজ, চরম দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে বিশ্ব
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অচলাবস্থা নিরসনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনা যখন স্থবির, ঠিক তখন গত ২৪ ঘণ্টায় এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে ২৬টি জাহাজের যাতায়াত তদারকি করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। বুধবার (২০ মে) ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইআরজিসি নৌবাহিনীর সরাসরি অনুমতি ও কঠোর তদারকিতেই এই জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলা শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো। যুদ্ধের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জলপথটি অবরুদ্ধ করে দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানি বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ আরোপ করে, যা ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তেল রফতানিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
### নতুন ‘নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক অঞ্চল’ ঘোষণা
একই দিন ইরানের ‘পার্সিয়ান গালফ স্টেট অথোরিটি’ (পিজিএসএ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে প্রণালির একটি অংশকে ‘নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের কঠোর বার্তা অনুযায়ী, তেহরানের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই এলাকা দিয়ে পার হতে পারবে না। এই নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলটি প্রণালির পূর্ব প্রবেশপথে ইরানের কুহ-ই মুবারক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহর দক্ষিণ পর্যন্ত এবং পশ্চিম প্রবেশপথে কেশম দ্বীপ থেকে উম্ম আল-কুওয়াইন পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে।
### বিশ্ব অর্থনীতি ও চরম খাদ্য সংকটের শঙ্কা
দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থান বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের শঙ্কা তৈরি করছে। বুধবার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, এই অচলাবস্থা বজায় থাকলে আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। সংস্থাটি এই পরিস্থিতিকে ‘খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থায় বড় সংকটের শুরু’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
রোমভিত্তিক এই সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই সংকট এখন আর কেবল জাহাজ চলাচল বা জ্বালানি বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এফএও-এর মতে, এই ধাক্কাটি কয়েকটি ধাপে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে:
* প্রথমে জ্বালানি ও সার সংকট দেখা দিচ্ছে।
* এরপর বীজের অভাব প্রকট হবে, যার ফলে সামগ্রিক কৃষিজ উৎপাদন কমে যাবে।
* শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের চরম মূল্যস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
### স্থবির শান্তি আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি হুমকি
বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় ‘অগ্রগতি’র কথা জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি কঠোর হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে সম্মত না হয়, তবে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করা হবে।
ট্রাম্পের এই হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, তবে তাতে আরও অনেক বড় চমক দেখা যাবে।” একই সুরে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরান যদি আবারও আক্রান্ত হয়, তবে এবার যুদ্ধের পরিধি এই অঞ্চলের বাইরেও বিস্তৃত করা হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সিনিয়র ফেলো উইল টডম্যান কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, “নিকট ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির মৌলিক কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ উভয় পক্ষই মনে করছে যে, এই অবস্থা যত দীর্ঘ হবে, অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে প্রতিপক্ষ তত বেশি দুর্বল হবে এবং এতে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।”
আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ