৬০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে ২ মাস পর হরমুজ প্রণালি পার হলো ৩ সুপারট্যাঙ্কার: জট খোলার ইঙ্গিত নাকি নতুন শঙ্কা?
পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চরম উৎকণ্ঠায় আটকে থাকার পর অবশেষে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে তিনটি সুপারট্যাঙ্কার। গতকাল বুধবার (২০ মে) এশিয়ার বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া এই বৃহৎ ট্যাঙ্কারগুলো ইরানের নির্দেশিত বিশেষ ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে উপসাগর থেকে বের হতে সক্ষম হয়। এলএসইজি (LSEG) এবং কেপলার-এর (Kpler) জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ ও সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে আসছে।
### গন্তব্য দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বাজার
আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার প্রথমে দুটি চীনা ট্যাঙ্কার প্রণালিটি সফলভাবে পার হয়। এরপরই কুয়েতের অপরিশোধিত তেল বোঝাই করা দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) ‘ইউনিভার্সাল উইনার’ প্রণালি অতিক্রম করে।
জানা গেছে, গত ৪ মার্চ ভিএলসিসিটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল লোড করা হয়েছিল। কেপলারের ডেটা অনুযায়ী, ট্যাঙ্কারটি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে দেশটির বৃহত্তম শোধনাগার ‘এসকে এনার্জি’ অবস্থিত। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৯ জুন সেখানে এই তেল খালাস করা হবে। তবে এ বিষয়ে এসকে এনার্জি এবং ট্যাঙ্কারের মালিক প্রতিষ্ঠান এইচএমএম (HMM) আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
### ২০ হাজার নাবিক আটকা ও চরম সামুদ্রিক ঝুঁকি
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করত। কিন্তু বর্তমান ভয়াবহ অচলাবস্থার কারণে পারস্য উপসাগরের ভেতরে শত শত জাহাজে প্রায় ২০ হাজার নাবিক মানবেতর অবস্থায় আটকা পড়ে আছেন।
কেপলার এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘সিনম্যাক্স’-এর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি ছোট জাহাজ উপসাগরে প্রবেশ করছে বা বের হচ্ছে, যার বেশিরভাগই সাধারণ মালবাহী জাহাজ এবং রাসায়নিক ও এলপিজি ট্যাঙ্কার।
### মাইন ও ড্রোনের হুমকিতে নতুন সতর্কতা
হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন ‘জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার’। মঙ্গলবার এক বিশেষ সতর্কবার্তায় সংস্থাটি জানায়, “এই এলাকায় জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলোর ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, এখানকার নৌ-পরিচালন পরিবেশ এখনও চরম ঝুঁকিপূর্ণ।” সংস্থাটির দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরানি ইউনিটগুলোর পক্ষ থেকে আগ্রাসী পদক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ করা গেছে।
এদিকে, বুধবার বৈশ্বিক জাহাজ শিল্প মালিকদের অ্যাসোসিয়েশনগুলো এই রুটে চলাচলের জন্য সংশোধিত ও নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। সেখানে ড্রোন হামলা, মাইন ঝুঁকি এবং সামরিক তদারকি হ্রাসের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নির্দেশনায় সতর্ক করে বলা হয়, “শত শত জাহাজ এখনও প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় রয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে একসাথে এত জাহাজের চলাচল একটি আকস্মিক ট্রাফিক জ্যাম বা বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ