দিনে সাড়ে চার ঘণ্টা স্ক্রিনে — ঢাকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপদে, পথ দেখাচ্ছে ফ্রান্স-সুইডেন-দক্ষিণ কোরিয়া
icddr,b-র সাম্প্রতিক তথ্য একটাই বার্তা দিচ্ছে — ঢাকার শিশুরা ভালো নেই।
ঢাকার স্কুলগামী শিশুদের ৮৩ শতাংশ প্রতিদিন আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত দুই ঘণ্টার সীমা ছাড়িয়ে গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুইজন শিশু উদ্বেগ, অতিসক্রিয়তা ও আবেগজনিত সমস্যায় ভুগছে। ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার। শিশুরা ঘুমাচ্ছে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা — যেখানে প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা।
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয় — এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের সতর্কসংকেত।
সমস্যা ডিভাইসে নয়, সিদ্ধান্তে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট নিজে থেকে শিশুর হাতে আসেনি — অভিভাবকরাই দিয়েছেন। এবং দেওয়ার কারণটাও পরিষ্কার — কমিউটে শিশুকে ব্যস্ত রাখতে, খাবার সময় চুপ করিয়ে রাখতে, বাসায় কাজের ফাঁকে সামলাতে। অনেকে এটাকে ‘স্কুলের দরকারে’ বা ‘নিরাপত্তার জন্য’ বলে যুক্তি দেন। কিন্তু বাস্তবে এটি সুবিধার জন্য অভিভাবকত্বকে ডিভাইসের হাতে ছেড়ে দেওয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, “স্ক্রিন টাইম কমাতে হলে বিকল্প সময় দিতে হবে। সমস্যার মূলে আছে — অভিভাবকরা নিজেদের কাজে এতটাই ব্যস্ত যে সন্তানকে শারীরিক বা মানসিক সময় দিতে পারছেন না।”
যে ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে না
অধ্যাপক আজহারুল জানান, দীর্ঘ স্ক্রিন টাইমের সবচেয়ে গভীর ক্ষতি হচ্ছে দুটি জায়গায় — সামাজিক দক্ষতা এবং মনোযোগ। শিশুরা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে, মুখোমুখি কথা বলতে এবং দীর্ঘ সময় একটি কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না। “মানসিক দিক থেকে এই দুটি সমস্যাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক,” বলেন তিনি।
icddr,b-র গবেষক শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, “শুধু নজর রাখাই যথেষ্ট নয় — সঠিক কাঠামো না থাকলে নজরদারি কাজে আসে না। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো জাতীয় নির্দেশিকাই নেই।”
ইউনেসকো ঢাকার শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রমজান আলী বলেন, “প্রযুক্তি এযুগের বড় আশীর্বাদ, কিন্তু সুচিন্তিত নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ব্যবহার করলে এটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”
বিশ্ব যা শিখেছে, বাংলাদেশ কি শিখবে?
যেসব দেশ ডিজিটাল শিক্ষায় সবার আগে বিনিয়োগ করেছিল, তারাই এখন সরে আসছে। ফ্রান্স স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছে, ইতালি একই পথে হেঁটেছে, দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৬ থেকে ক্লাসে ফোন ব্যবহার আইনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। সুইডেনের জনস্বাস্থ্য সংস্থা দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য শূন্য স্ক্রিন টাইম সুপারিশ করেছে। ইউনেসকো বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন কেবল তখনই থাকবে যখন সুনির্দিষ্ট শিক্ষামূলক প্রয়োজন আছে।
সুইডেন যখন শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখছে, বাংলাদেশ তখন ছয় বছর বয়সীদের হাতে ট্যাবলেট দিচ্ছে।
সমাধান কোথায়?
অধ্যাপক আজহারুল ইসলামের পরামর্শ সহজ কিন্তু গভীর — “সচেতনতা আসলে শিশুদের চেয়ে বড়দের বেশি দরকার। যদি নিজের সময়সূচি থেকে সামান্য সময় বের করে সন্তানের সঙ্গে গল্প করা, খেলা বা তার আগ্রহ নিয়ে কথা বলা যায় — তাহলেই সমাধান সম্ভব।”
icddr,b শীঘ্রই এ বিষয়ে কার্যকর নির্দেশিকা তৈরিতে গবেষণা শুরু করছে। তবে গবেষণার আগেই যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া দরকার, সেটি নীতিনির্ধারকদের নয় — সেটি প্রতিটি অভিভাবকের।
ঢাকা ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ