মেগা ডিসকাউন্টেও জমছে না ঈদের বাজার, মূল্যস্ফীতিতে হাত গুটিয়েছেন ঢাকার ক্রেতারা

admin

May 23, 2026

মেগা ডিসকাউন্টেও জমছে না ঈদের বাজার, মূল্যস্ফীতিতে হাত গুটিয়েছেন ঢাকার ক্রেতারা

বাণিজ্য ও অর্থনীতি প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, বাংলাদেশ: বিপণিবিতানগুলোর সামনে ঝুলছে ‘ফ্ল্যাট ৫০% ছাড়’-এর চোখধাঁধানো ব্যানার, শোরুমের ভেতরে থরে থরে সাজানো নতুন পোশাক, অথচ ক্রেতার অপেক্ষায় অলস সময় পার করছেন বিক্রয়কর্মীরা। আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বেইলি রোড বা বসুন্ধরা সিটির মতো বড় বড় শপিং মলগুলোতে এখন এমনই এক মন্দাভাব বিরাজ করছে। ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর আকর্ষণীয় ছাড়ের ছড়াছড়ি সত্ত্বেও এবারের ঈদের বাজার ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

লৈঙ্গিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মধ্যবিত্তের পকেটে টান এবং তীব্র দাবদাহের কারণে ঢাকার বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি ও কেনাকাটার হার গত বছরের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। লোকসান না হলেও লাভের খাতা প্রায় শূন্য বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বেচাকেনায় মন্দা: শোরুম ম্যানেজারদের হতাশা
বেইলি রোডের ‘ইনফিনিটি’ মেগা মলের ম্যানেজার শাহরিয়ার সুলতান জানান, “গত বছরের তুলনায় এবার কাস্টমার অনেক কম। সন্ধ্যায় কিছুটা ভিড় হলেও তা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা এনে দিচ্ছে না। আমাদের এই ব্রাঞ্চটি তাও কিছুটা চলছে, কিন্তু অন্যান্য শোরুমের অবস্থা খুবই নাজুক।”

একই চিত্র দেখা গেছে ‘আর্টিসান’ শোরুমেও। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার দীপ্ত দাস এই মন্দার পেছনে তীব্র গরম এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। তিনি জানান, রাত ৮টার পর দোকান খোলা রাখার সময়সীমা শিথিল করা হলেও গত বছরের মতো ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় এবার উধাও। অন্যদিকে, বসুন্ধরা শপিং মলের ‘জেন্টল পার্ক’-এর বিক্রয়কর্মী জিসান বলেন, “রাত ১০টার মধ্যে সব বন্ধ করতে হয়। অথচ ঈদের বাজার জমে মূলত সন্ধ্যার পর। শপিংয়ের সময়সীমা আরও বাড়ানো হলে সবার জন্যই ভালো হতো।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতারা এখন কেনাকাটার চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ মেটাতেই বেশি হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই শুধু দরদাম দেখছেন, কিন্তু কিনছেন না।

অর্থনৈতিক চাপ ও বদলে যাওয়া ক্রেতা অভ্যাস
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরণের শঙ্কা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (PRI) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন:

> “ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের মনে এক ধরণের অর্থনৈতিক আতঙ্ক কাজ করছে। ফলে মানুষ অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া অন্য খাতে খরচ কমিয়ে দিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ৪.৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং গত ১২ মাস ধরে আমদানি-রপ্তানিও চাপের মুখে রয়েছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মুবিনা খোন্দকার জানান, ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি ক্রেতাদের আনুগত্য থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু ডিসকাউন্ট দিয়ে বাজার চাঙ্গা করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি অনলাইন শপিংয়ের জনপ্রিয়তাও শোরুমগুলোর বেচাকেনা কমিয়ে দিয়েছে।

কোরবানির ঈদে অগ্রাধিকার পশুর হাটে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষক ও সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঈদের পোশাকের বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। ছাড় দিলেও ক্রেতারা এখন অনেক বেশি সতর্ক।”

ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘সেইলর’-এর ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার মো. সাদেকুজ্জামান খান বাজারের এই ভিন্ন রূপের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “ঈদুল আজহায় মানুষের মূল মনোযোগ এবং বাজেট থাকে কোরবানির পশুর দিকে। ফলে লাইফস্টাইল বা পোশাকের বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ পড়ে। তবে এখন ক্রেতারা শুধু ডিসকাউন্ট দেখে কেনেন না; কাপড়ের মান, নতুন ডিজাইন এবং ব্র্যান্ডের অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিচ্ছেন।”

ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও ব্যবসায়ীরা এখনো একটি শেষ মুহূর্তের ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় দিন গুনছেন। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া খুচরা বাজারে এই মন্দা সহজে কাটবে না বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

অর্থনীতি ও বাণিজ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ