দেশের এক-তৃতীয়াংশ জেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূচকে ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কা
দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেলায় সরকারি পর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের অস্থায়ী ব্যবস্থার বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা যেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, দীর্ঘদিনের নীতিগত অবহেলা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে এই সংকট বর্তমান সময়ে তীব্রতর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খোদ রাজধানী ঢাকাতেই এই চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উদাহরণস্বরূপ, রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা শাহিদা বেগম (৩৮) দিনমজুর স্বামী বাবুল হোসেনের সংসারে ইতিমধ্যে ৮ সন্তানের জননী হয়েছেন। সন্তানদের ভরণপোষণ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পেরে প্রতিনিয়ত চোখের পানি ফেলছেন এই দম্পতি। প্রান্তিক অঞ্চল তো দূরের কথা, খোদ রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের কাছেই পরিবার পরিকল্পনার বার্তা ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না, যা এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্ট করে।
জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট) ছিল প্রতি নারীতে গড়ে ৬.৩ সন্তান। দীর্ঘ ৩০ বছরের ধারাবাহিক কার্যক্রমে তা কমে ৩.০-এ নেমে আসে এবং ২০২২ সালে তা আরও হ্রাস পেয়ে ২.৩-এ দাঁড়ায়। তবে দীর্ঘ কয়েক দশক পর ২০২৩ সাল থেকে এই সূচকটি পুনরায় বাড়তে শুরু করে বর্তমানে ২.৪ সন্তানে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী রূপ নিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের ভয়াবহতা তুলে ধরে ঢাকার দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, গত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে সব ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট চলছে। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তারা অধিদপ্তর থেকে পর্যাপ্ত সামগ্রী পাচ্ছেন না, যার ফলে সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, টেন্ডার জটিলতা ও দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ। তিনি এই পরিস্থিতির জন্য বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারকে সরাসরি দায়ী করে বলেন, “এর পেছনে মূল কারণ হলো ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতি। যথাযথ প্ল্যান পাস না করেই এই সংবেদনশীল খাতে কেন এমন স্থবিরতা তৈরি করা হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
জনসংখ্যা নীতিতে চরম উদাসীনতার কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মো. বেলাল হোসেন বলেন, “বিগত ১৯ বছর ধরে জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিলের (ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল) কোনো নীতিগত সভা বা মিটিং অনুষ্ঠিত হয়নি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে যদি আমরা ধরে রাখতে চাই, তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও আগামীতে নির্বাচিত সরকারের উচিত দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই কাউন্সিলের মিটিং আহ্বান করে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর এই তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট পরিবার পরিকল্পনা খাতে বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের কষ্টার্জিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত অগ্রগতিকে বহু বছর পিছিয়ে দিতে পারে।
জাতীয় ও স্বাস্থ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ