ওসমান হাদি হত্যা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য: মমতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্রের হত্যাকাণ্ড ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জড়িয়ে মন্তব্যের জেরে শিলিগুড়িতে মামলা; গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির হুঁশিয়ারি।
ঢাকা: বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বিস্ফোরক মন্তব্যের জেরে এবার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভারতের শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানায় মমতার বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের প্রবীণ আইনজীবী রিংকু চ্যাটার্জি সিং। অভিযোগকারীর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনমনে তীব্র ঘৃণা ও বিভেদ তৈরির অপচেষ্টা করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরাসরি ভারত সরকার এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে জড়িয়ে তার দেওয়া বক্তব্য আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের ভাবমূর্তি ও সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। এই ধরনের মন্তব্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় কূটনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দুই দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করতে পারে বলে অভিযোগপত্রে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি নথির বরাত দিয়ে জানা গেছে, সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ১৫২, ১৫৩, ১৫৩(এ), ১৯১, ১৯২, ১৯৬, ৩৫১, ৩৫২ এবং ৩৫৩-সহ একাধিক কঠোর ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৫২ ধারাটি ভারতের নতুন ফৌজদারি আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দেশের sovereignty বা সার্বভৌমত্ব, একতা এবং অখণ্ডতাকে বিপন্ন বা ক্ষুণ্ণকারী যেকোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। এছাড়া একই আইনের ১৫৩ ধারা অনুযায়ী, ভারত সরকারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ Relationships বা সম্পর্কে থাকা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, যুদ্ধের চেষ্টা চালানো বা শত্রুতামূলক কাজে সহায়তা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। একই সাথে ১৫৩ (এ) ধারায় ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ ছড়ানো এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপরাধের উপাদান থাকায় মমতার বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী আইনজীবী রিংকু চ্যাটার্জি সিং সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অবিলম্বে মমতার এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন এবং আগামী ৮ জুন গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে হাইকোর্ট খুললেই সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির দাবিতে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করবেন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর গত মঙ্গলবার নিজের প্রথম political বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ওসমান হাদি হত্যা প্রসঙ্গ টেনে এই অভূতপূর্ব বিস্ফোরক দাবি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই রাজনৈতিক জনসভা থেকে তিনি সরাসরি দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে আসা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মূল হত্যাকারীদের রাজ্য পুলিশের বিশেষ শাখা এসটিএফ গ্রেপ্তার করার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং তাকে ফোনে গোপন করার অনুরোধ করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করার পর রাজ্য পুলিশের এসটিএফের দুর্দান্ত অভিযানে ধরা পড়ে, যা ছিল রাজ্য পুলিশের একটি বড় কৃতিত্ব। কিন্তু এরপরই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে তাকে ফোন করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন যে, এটি একটি সংবেদনশীল দেশীয় ব্যাপার এবং রাজ্য পুলিশকে যেন নির্দেশ দেওয়া হয় এটি যেন কোনোভাবেই গণমাধ্যম বা বাইরে প্রকাশ না পায়।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ওই সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, কাকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটি করানো হয়েছিল এবং এর পেছনে কার কার নাম বেরিয়ে এসেছিল তা আজকের কেন্দ্রীয় সরকার পরিবর্তন হলেও তিনি খুব ভালো করেই জানেন। নিজের হৃদয়কে তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতদিন দেশের স্বার্থে তিনি মুখ খোলেননি, কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অত্যাচার শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়ার কারণে তিনি জনসমক্ষে এই সত্য বলতে বাধ্য হয়েছেন। তবে নির্দিষ্ট করে কোনো অপরাধীর নাম বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, সেই নির্দিষ্ট নামটি মুখে আনলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ চরম উত্তাল হয়ে উঠবে। বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন বলেই এবং ভারতের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতেই তিনি এই মুহূর্তে সেই কুশীলবদের নাম প্রকাশ করছেন না বলে দাবি করেন। মমতার এমন মন্তব্যের পর ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ