ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা করলেন শেখ মুজিবুর রহমান
টিকা আমদানিতে মারাত্মক বিলম্ব এবং ব্যবস্থাপনাগত অবহেলার কারণে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেছেন কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান। আজ সোমবার (৮ জুন) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে উপস্থিত হয়ে তিনি নিজে বাদী হয়ে এই নজিরবিহীন মামলার আবেদনটি দায়ের করেন। আদালত মামলার আবেদনটি গ্রহণ করার বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ। দেশের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংসদ সদস্য কর্তৃক সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সরাসরি আদালতে গিয়ে এমন গুরুতর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনায় আজ আদালত পাড়াসহ পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বাদী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আবেদনে দণ্ডবিধির ৪০৯ (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক বিশ্বাসের অপরাধমূলক লঙ্ঘন), ৪২০ (প্রতারণা), ২৭০ (মারাত্মক রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাজনক কাজ), ৩০৪ (অপরাধমূলক নরহত্যা) এবং ৩৪ (পরস্পর যোগসাজশ) ধারায় ড. ইউনূসসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর সব অভিযোগ এনেছেন। মামলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়া অন্য যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন—সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর। আজ আদালতে শুনানির সময় বাদী শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান।
আদালতে দেওয়া শেখ মুজিবুর রহমানের আরজি অনুযায়ী, বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশুদের সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে অত্যন্ত নিয়মিতভাবে হাম ও রুবেলার প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। তবে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে টিকা আমদানির যে দীর্ঘকালীন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া সচল ছিল, তা আসামিরা কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিকল্প উপায়ে টিকা আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আসামিদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের কারণে দেশজুড়ে শিশুদের অত্যাবশ্যয়কীয় এই টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়, যা মূলত আসামিদের সুপরিকল্পিত ও চরম অবহেলা।
বাদীপক্ষ মামলার অভিযোগে আরও উল্লেখ করেছে, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স—যাকে এই মামলায় অন্যতম প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে—পূর্বে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে সম্ভাব্য টিকা সংকটের বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য বিভাগকে একাধিকবার লিখিত চিঠির মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছিল। সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও তৎকালীন নীতি-নির্ধারকেরা সেই সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ আমলে নেননি। শেখ মুজিবুর রহমান আরজিতে সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে দাবি করেন, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ৭৫,৭০৮ জন নিষ্পাপ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও টিকার অভাবে অন্তত ৬১০ জন শিশুর নির্মম মৃত্যু ঘটেছে। এছাড়া প্রায় ৭৫ হাজারেরও বেশি শিশু এই কারণে শারীরিকভাবে মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার হয়েছে। অভিযোগপত্রে সুনির্দিষ্টভাবে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের একটি ঘটনা এবং ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর বিবরণও পৃথকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
অপরাধ ও আদালত প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা