বাংলাদেশে হু হু করে বাড়ছে অননুমোদিত সাবস্ক্রিপশন বাজার, ঝুঁকিতে সাইবার নিরাপত্তা
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রিমিয়াম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিভিন্ন দরকারি সফটওয়্যার টুলের অননুমোদিত বা ইনফরমাল রিসেলার নেটওয়ার্কের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এবং চড়া সাবস্ক্রিপশন ফির কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীরা অফিশিয়াল সেবা না নিয়ে এসব রিসেলারের দ্বারস্থ হচ্ছেন। প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমান্তরাল বাজার দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল চাহিদাকে মেটালেও ব্যবহারকারীদের মারাত্মক সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকিতে ফেলছে।
সাধারণত বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর অফিশিয়াল সাবস্ক্রিপশন ফি মার্কিন ডলারে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়, যা অধিকাংশ বাংলাদেশির জন্য অত্যন্ত জটিল বা অপ্রাপ্য। এই সুযোগে স্থানীয় রিসেলাররা বিভিন্ন ফ্যামিলি বা টিম প্ল্যান ব্যবহার করে কিংবা কম মূল্যের অঞ্চলের (আঞ্চলিক প্রাইসিং) প্যাকেজগুলো পাইকারি দরে কিনে তা দেশীয় মুদ্রা তথা বিকাশ বা নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে খুচরা বিক্রি করছে। মূল্যের এই পার্থক্য বিশাল। যেমন, চ্যাটজিপিটি প্লাস (ChatGPT Plus) যেখানে অফিশিয়ালি মাসে প্রায় ২,৪০০ থেকে ২,৫০০ টাকা লাগে, সেখানে স্থানীয় রিসেলাররা তা মাত্র ৪০০ টাকায় দিচ্ছে। একইভাবে ক্যানভা প্রো (Canva Pro) বা ভিপিএন সেবাগুলো ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় এবং নেটফ্লিক্সের প্রিমিয়াম ফোর-কে প্ল্যান মাত্র ৪৫০ টাকায় শেয়ার্ড প্রোফাইলের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া অফিশিয়ালি ২৩৯ টাকা মূল্যের ইউটিউব প্রিমিয়ামও মিলছে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়।
আইসিটি বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা বার্ষিক প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বাজার তৈরি করেছেন। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ফ্রিল্যান্সারের মাসিক গড় আয় ২০৯ ডলার বা তার কম। ফলে তাদের পক্ষে প্রতি মাসে একাধিক সফটওয়্যারের পূর্ণ মূল্য দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে প্রিমিয়াম টুলের ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ক্ষুদ্র এজেন্সি বা শিক্ষার্থীদের পক্ষে সবার জন্য আলাদা অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট কেনা বড় আর্থিক বোঝা। ফলে তারা কয়েকজন মিলে টাকা ভাগাভাগি করে স্থানীয় বিক্রেতাদের কাছ থেকে যৌথভাবে এসব সেবা কিনছেন।
তবে এই কম মূল্যের অননুমোদিত সেবাগুলো আপাতদৃষ্টিতে সাশ্রয়ী মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে মারাত্মক সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শেয়ার্ড অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ফলে ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং হিস্ট্রি, এআই প্রম্পট এবং ব্যক্তিগত অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য অন্যদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক রিসেলার অ্যাকাউন্ট সেটআপের নামে গ্রাহকের ইমেইল ক্রেডেনশিয়াল, পাসওয়ার্ড বা ডিভাইসের রিমোট অ্যাক্সেস চেয়ে থাকেন, যা পরিচয় চুরি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া কিছু গ্রুপ-বাই সার্ভিস ব্রাউজার এক্সটেনশন ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা দেয়, যা ব্যবহারকারীর সেশন কুকিজ ও সম্পূর্ণ অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি চালাতে পারে।
বর্তমানে এই বিশাল বাজারটি সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত এবং একটি আইনি ধূসর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অধীনে সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন রিসেলিং বা শেয়ারিংয়ের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো লাইসেন্সিং কাঠামো নেই। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং স্থানীয় মুদ্রায় পেমেন্ট করার সুযোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক মূল্য নির্ধারণ (Regional Pricing) কাঠামো তৈরি করতে হবে। যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক সফটওয়্যারের মূল্য দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, ততক্ষণ এই ঝুঁকিপূর্ণ সমান্তরাল বাজার বন্ধ করা কঠিন হবে।
আইটি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ