সম্পদ কর ও কালো টাকার দায়মুক্তি নীতি থেকে সরছে সরকার

admin

June 4, 2026

সম্পদ কর ও কালো টাকার দায়মুক্তি নীতি থেকে সরছে সরকার

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বহুল আলোচিত সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে আসছে সরকার। একই সঙ্গে আবাসনসহ প্রধান প্রধান বিনিয়োগ খাতে সর্বাত্মক আইনি দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার যে প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, গণসমালোচনা ও বিতর্কের মুখে সেখান থেকেও সরকার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর পাশাপাশি মোটরসাইকেল মালিক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর ঢালাও কর আরোপের চিন্তা বাতিল করে কেবল উচ্চ সিসির মোটরবাইকের ওপর এককালীন কর নির্ধারণের নতুন কৌশল নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের এক নীতি নির্ধারণী বৈঠকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করের চাপ সৃষ্টি হয় কিংবা জনমনে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি করতে পারে, এমন কোনো নীতি নতুন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবেই অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে সর্বাত্মক দায়মুক্তি দেওয়া এবং মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর ঢালাও করের প্রস্তাব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত হয়। সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্সের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এর প্রভাব বিশ্লেষণ (ইমপ্যাক্ট অ্যানালিসিস) করে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরির নির্দেশনা দেওয়ায় আগামী বাজেটে এটি আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যদিও এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, সমাজে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমাতে এই কর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু এ খাত থেকেই বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের অর্থনীতি ও কর বিশেষজ্ঞরা। সাবেক এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম মনে করেন, ওয়েলথ ট্যাক্স চালুর সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা যৌক্তিক হবে না। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে ওয়েলথ ট্যাক্স একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হতে পারত, সরকার হয়তো এক ধরনের ভয়ের কারণে এই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থকে সহজ উপায়ে বিনিয়োগে আনার ব্যবস্থার পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর কর আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্তটিকেও যৌক্তিক বলে অভিহিত করেন।

ভিন্নমত প্রকাশ করে আয়কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া ওয়েলথ ট্যাক্স চালু করলে সমাজে উল্টো বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। কারণ যারা সততার সাথে তাদের সম্পদ ঘোষণা করেন, মূলত তারাই এই করের আওতায় আসবেন; অন্যদিকে যারা সম্পদ গোপন রাখেন, তারা করের বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়া ওয়েলথ ট্যাক্সের জন্য সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া, যা দেশে বিপুলসংখ্যক আইনি বিরোধ ও মামলার সৃষ্টি করতে পারে। তিনি ভারতকে উদাহরণ হিসেবে টেনে বলেন, যেসব দেশ ওয়েলথ ট্যাক্স চালুর পর তা আবার প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সরকারের উচিত তাদের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা ও নীতি পরিবর্তনের কারণগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা।

মূলত মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর বাইকারদের একটি বড় অংশ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকেও উৎস নিয়ে প্রশ্নহীন দায়মুক্তি দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করা হয়। বর্তমানে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও দায়মুক্তির ব্যবস্থা নেই, অর্থাৎ প্রযোজ্য কর ও ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের যে কোনো সংস্থা ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তৎকালীন সরকার মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে প্রশ্নহীন দায়মুক্তিতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিলে রেকর্ড ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ সাদা হয়েছিল এবং সরকার দুই হাজার কোটি টাকার কর পেয়েছিল, তবে নীতিগতভাবে সেটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সেই বিতর্কের পুনরাবৃত্তি এড়াতেই সরকার এবার শেষ মুহূর্তে পিছু হটল।

অর্থনীতি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ