কাপ্তানবাজারে কাঁঠালপাতার মহোৎসব: দিনে ২৫ হাজার টাকার বাণিজ্য, ঈদে বাজার দ্বিগুণ

admin

May 23, 2026

কাপ্তানবাজারে কাঁঠালপাতার মহোৎসব: দিনে ২৫ হাজার টাকার বাণিজ্য, ঈদে বাজার দ্বিগুণ

ফিচার ডেস্ক, RDM News 24
ঢাকা, বাংলাদেশ: কংক্রিটের এই ব্যস্ত নগরী ঢাকায় একটি কাঁঠালগাছ খুঁজে পাওয়া যেখানে দুষ্কর, সেখানে প্রতিদিন কাপ্তানবাজারে বিক্রি হচ্ছে হাজার হাজার টাকার কাঁঠালপাতা! ছাগল ও ভেড়ার প্রধান এবং প্রিয় খাদ্য এই কাঁঠালপাতা ঘিরেই রাজধানী বুকে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী ও লাভজনক ব্যবসা। কাপ্তানবাজারের আড়তে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২৫ হাজার টাকার কাঁঠালপাতা কেনাবেচা হলেও আসন্ন কোরবানির ঈদে এই বাজারের আকার ও টাকার অঙ্ক ছাড়িয়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি।

ঢাকার বুকে তিন বড় আড়ত—গাবতলী, যাত্রাবাড়ী ও কাপ্তানবাজারে প্রতিদিন মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোর থেকে হাজার হাজার ছাগল আসে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া এই পশুদের চাঙ্গা রাখতে কাঁঠালপাতার কোনো বিকল্প নেই।

ব্যবসায়ীদের মতে, কাঁঠালপাতা ছাগলের জন্য ওষুধের মতো কাজ করে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্লান্তি দূর করে। ঢাকায় ঘাস না থাকায় ছাগলের খাবারের পুরো চাপটাই পড়ে এই পাতার ওপর।

কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুর থেকে পাতার জোগান
কাপ্তানবাজারে এই পাতার মূল জোগানদাতা কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের বনাঞ্চল। কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া, কলাতিয়া ও রোহিতপুর এবং গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের লালচে-বাদামি মাটির সুস্বাদু কাঁঠালপাতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

এই ব্যবসার একটি নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। শুধু পাতা সংগ্রহের জন্য গাছের মালিককে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এরপর চোখের আন্দাজে মোট পাতার অর্ধেক রেখে বাকিটা সাবধানে পেড়ে আনা হয়। কাপ্তানবাজারে ১০টি আঁটি নিয়ে তৈরি হয় একেকটি গাট্টি। সাধারণ সময়ে প্রতিটি আঁটি ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও ঈদের মৌসুমে তা ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর পাইকারিতে একেক গাট্টি পাতা বিক্রি হয় সাড় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। কাপ্তানবাজারে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২৫ গাট্টি পাতা নগদ টাকায় বিক্রি হয়।

চা বিক্রেতা থেকে পাতার মহাজন: মিজানের গল্প
এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে অনেক মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প। রংপুরের উলিপুর থেকে ছোটবেলায় পালিয়ে আসা মিজান রহমান (৩২) দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। একসময় যাত্রাবাড়ীর চায়ের দোকানে ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করা মিজান ওস্তাদ শাহ আলমের হাত ধরে এই ব্যবসায় আসেন। গাছ চেনা, গাছে ওঠা, পাতা বাছাই এবং তা ট্রলিতে করে আড়তে নিয়ে আসার সমস্ত কলাকৌশল শিখে আজ তিনি নিজেই একজন সফল ব্যবসায়ী। কেরানীগঞ্জের গৃহস্থদের সঙ্গে এখন তার দীর্ঘদিনের চেনা যোগাযোগ।

গাছের কষ্ট ও মিজানের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
ব্যবসা লাভজনক হলেও মিজান আর বেশিদিন এই পেশায় থাকতে চান না। ডাল ভাঙার সময় গাছের নিঃসৃত কষ দেখে এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করেন তিনি। আবেগপ্রবণ হয়ে মিজান বলেন:

“গাছেরও নিশ্চয়ই কষ্ট হয়, আমাদের মতো কেবল মুখ ফুটে বলতে পারে না। একেকটি ডাল ভাঙি আর দেখি অনেক কষ বের হচ্ছে। আমার তখন খুব খারাপ লাগে। মনের ভেতর একটা হাহাকার তৈরি হয়।”

বর্তমানে কাপ্তানবাজারের আড়ত সংলগ্ন একটি ভবনে প্রায় ৩০০ ব্যাপারী ও পাইকারের সঙ্গে মেসে থাকেন মিজান। কষ্টার্জিত টাকা জমিয়ে উলিপুরে নিজের পরিবার ও দুই মেয়ের জন্য পাঠাচ্ছেন। মিজানের শেষ ইচ্ছা, পর্যাপ্ত পুঁজি জমিয়ে একদিন তিনি নিজেই ছাগল কেনাবেচার ব্যবসা শুরু করবেন, যাতে আর কখনো কোনো জীবন্ত গাছের ডাল ভাঙতে না হয়।

ফিচার ও বাণিজ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ