ঢাকার লেকের মাছে ও পানিতে উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী
পরিবেশ ও স্বাস্থ্য প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, বাংলাদেশ: রাজধানীর অন্যতম প্রধান তিন লেক—ধানমণ্ডি, গুলশান ও হাতিরঝিলের পানি, তলানির কাদা এবং মাছে আশঙ্কাজনক মাত্রায় বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হেলিয়ন’-এ প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ‘অ্যাবানডেন্স অ্যান্ড ক্যারেক্টারিস্টিকস অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন মেজর আরবান লেকস অব ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণাটি জলজ খাদ্যশৃঙ্খল এবং ঢাকার জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক অশনিসংকেত।
গবেষক ফারিহা তাহসিন মার্সি, অধ্যাপক এ.কে.এম রাশিদুল আলম এবং মো. আহিদুল আকবরের যৌথ পরিচালনায় দেখা গেছে, রাজধানীর এই ফুসফুসগুলো মূলত প্লাস্টিক বর্জ্যের স্থায়ী আধারে পরিণত হয়েছে।
গুলশান লেকে প্লাস্টিক দূষণ সবচেয়ে বেশি
গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, তিন লেকের মধ্যে গুলশান লেক প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই লেকের উপরিভাগের প্রতি লিটার পানিতে ৩৬টি এবং তলানির প্রতি কেজি কাদায় ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে। মাত্রাতিরিক্ত শিল্পবর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত পয়েন্টোনিষ্কাশন লাইনের সরাসরি সংযোগই এর মূল কারণ। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত পথ না থাকায় গুলশান ও হাতিরঝিল লেক মূলত মাইক্রোপ্লাস্টিকের ‘সিঙ্ক’ হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, আবাসিক এলাকায় অবস্থানের কারণে ধানমণ্ডি লেকের পানিতে দূষণের হার তুলনামূলক কিছুটা কম।
মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে ধানমণ্ডি লেক
গবেষণার সবচেয়ে আতঙ্কের দিক হলো লেকের মাছের নমুনা পরীক্ষা। তেলাপিয়া, কাতলা ও শোলসহ সাতটি প্রজাতির মোট ৯০টি মাছ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশ মাছের শরীরেই প্লাস্টিক কণা মিশে গেছে। তবে পানির তুলনায় মাছের ভেতরের দূষণে শীর্ষে রয়েছে ধানমণ্ডি লেক। এই লেকের একটি তেলাপিয়া মাছের ভেতরে সর্বোচ্চ ১৭টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে এবং প্রতিটি মাছে গড়ে ৮.২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।
বিশেষজ্ঞের কড়া হুঁশিয়ারি: ‘বিনামূল্যে দিলেও এই মাছ খাবেন না’
ঢাকার লেকের মাছ খাওয়া নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের প্রখ্যাত পানি সম্পদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন:
> “মানুষের উচিত ঢাকার এই দূষিত লেক ও নদীর মাছ খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা। কেউ যদি আপনাকে ধানমণ্ডি, গুলশান বা বুড়িগঙ্গার মাছ বিনামূল্যেও দেয়, দয়া করে তা খাবেন না। এসব জলাশয় চরম দূষিত ও বিষাক্ত। পানির নিচে স্তরে স্তরে পলিথিন জমে আছে। এই পরিবেশগত বিপর্যয় এখন উপকূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।”
উৎস ও মানবদেহে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি
উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণ (FTIR) পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকরা লেকের পানি ও মাছে উচ্চ ঘনত্বের পলিথিন (HDPE), পিভিসি, পলিকার্বোনেট এবং পলিপ্রোপিলিনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন—যা মূলত দুধের প্যাকেট, ডিটারজেন্ট বোতল ও গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্য থেকে আসে। মাত্রাতিরিক্ত দূষণে গুলশান লেকের দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার নিচে নেমে গেছে, যা জলজ প্রাণীর জন্য অনুপযুক্ত। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মাছের মাধ্যমে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করলে তা কোষের মারাত্মক ক্ষতি ও অভ্যন্তরীণ প্রদাহ তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যানসারের মতো জটিল রোগের প্রধান কারণ হতে পারে।
প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা
২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও মাঠপর্যায়ে এর অপব্যবহার থামানো যায়নি। বর্তমানে প্রতি মাসে ঢাকার পরিবেশে প্রায় ৮ হাজার বিলিয়ন মাইক্রো-বিডস নির্গত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের এই লেকগুলোকে বাঁচাতে এবং নগরবাসীকে ক্যানসারসহ বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এখনই কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ