বিশ্ব ‘জঙ্গলের শাসনে’ ফেরার ঝুঁকিতে: বেইজিংয়ে শি-পুতিন জরুরি বৈঠক

admin

May 21, 2026

বিশ্ব ‘জঙ্গলের শাসনে’ ফেরার ঝুঁকিতে: বেইজিংয়ে শি-পুতিন জরুরি বৈঠক

বিশ্ব আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুনরায় ‘জঙ্গলের শাসনে’ (জোর যার মুল্লুক তার) ফিরে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত বেইজিং সফরের মাত্র কয়েকদিন পরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে এক হাই-প্রোফাইল শীর্ষ বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন। একই সাথে শি জিনপিং চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে বর্তমান ভঙ্গুর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আজ বুধবার (২০ মে) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতার মধ্যে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ওয়াশিংটনের সাথে বেইজিং-মস্কোর ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে এই বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

দ্বিপাক্ষিক আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলে জাঁকজমকপূর্ণ ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দুই নেতার উপস্থিতিতে চীনের সামরিক ব্যান্ড দল রাশিয়া ও চীনের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে। এ সময় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির একটি চৌকস দল প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। দুই নেতা যখন গ্রেট হলে প্রবেশ করছিলেন, তখন দুই দেশের পতাকা হাতে একদল শিশু চীনা ভাষায় “স্বাগতম, স্বাগতম!” ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত করে তোলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জমকালো দৃশ্য গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আড়ম্বরপূর্ণ স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। যেখানে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির দেশের নেতারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ইরান সংঘাত এবং তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন।

শি ও পুতিনের মধ্যকার মূল আলোচনাটি প্রথমে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে দুই নেতার মধ্যে একান্ত বৈঠকের মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলসহ একটি বিস্তৃত বিন্যাসের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় শেষ হয়।

বৈঠক শেষে দুই রাষ্ট্রপ্রধান প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদসহ কৌশলগত বিভিন্ন খাতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেন। জানা গেছে, নথিপত্রগুলোর মধ্যে ২৫ বছর আগে প্রথম স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক “চীন-রাশিয়া সুপ্রতিবেশীসুলভ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি”-র মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চুক্তি স্বাক্ষর শেষে শি জিনপিং বলেন, “বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক এখন ইতিহাসের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্বের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব ধরনের একতরফা আধিপত্যবাদ, উৎপীড়ন এবং ব্লকের রাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের যৌথ অবস্থান বজায় থাকবে।”

বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শি জিনপিং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো বৈরিতা বা নতুন করে যুদ্ধ বাড়ানো সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত। এই মুহূর্তে সেখানে একটি ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে জরুরি।

অন্যদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মস্কো চীনের জন্য একটি “নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সরবরাহকারী” হিসেবে পাশে থাকবে বলে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন। একই সাথে পুতিন আগামী বছর শি জিনপিংকে পুনরায় রাশিয়া সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে শি জিনপিং রুশ প্রেসিডেন্টকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত ও ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় উদ্যান ‘ঝংনানহাই’-এ এক ঘরোয়া চা চক্রে মিলিত হন, যা বর্তমানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) সদর দফতর।

এদিকে, পুতিনের এই সফরটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফরের সাথে কতটা তুলনীয়—গণমাধ্যমের এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “সব সময় দুটি ভিন্ন সফরের বাহ্যিক রূপ তুলনা করা সহজ নয়। আসল গুরুত্ব নিহিত থাকে পর্দার আড়ালের আলোচনার গভীরতায়, আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বরে নয়।”

তবে বেইজিং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সমান্তরাল কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। শি যখন পুতিনকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে এবং গত বছর কুয়ালালামপুরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ট্রাম্প গত সপ্তাহে এই বোয়িং ক্রয়ের ইঙ্গিত দিলেও, বেইজিং এবারই প্রথম তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করল।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া-প্যাসিফিক কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যকার একটি সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি ক্রেমলিন।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ