১৯৯৬ সালের ২০ মে দেশে ঘটে যাওয়া সেই স্মরণীয় ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান এবং পর্দার পেছনের অজানা ইতিহাস
আজ থেকে ঠিক তিন দশক আগে, ১৯৯৬ সালের ২০শে মে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সেনাবাহিনীর একদল সদস্য যখন ঢাকার অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন, তখন অন্য আরেকটি দল তাদের পথরোধ করতে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির পর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইছিল। ঠিক তার পরেই দেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে যুক্ত হয় এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়, যা একটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান হিসেবে পরিচিত।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির বিশদ বিবরণ তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব এম. এ. হাকিমের ‘একটি সামরিক অভ্যুত্থান: ব্যর্থ প্রয়াস’ এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এম এ মতিনের ‘আমার দেখা ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান ‘৯৬’ বইসহ বিভিন্ন গবেষকদের লেখায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে হয়েছিল
এই সামরিক অস্থিরতার নেপথ্যে ছিল দুই শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসর। ১৯৯৬ সালের ১৮ই মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের নির্দেশে বগুড়া সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ খান এবং বিডিআরের উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমানকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এই দুই কর্মকর্তা তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তাকে না জানিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম। তিনি রাষ্ট্রপতির এই আদেশ মেনে না নিয়ে নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের নিয়ে পাল্টা পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেন। এর অংশ হিসেবে ১৯শে মে সেনাপ্রধানের নির্দেশে মেজর জেনারেল আব্দুল মতিন, মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া, ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রহিম এবং কর্নেল আব্দুস সালামের মতো কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বাসার টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়, কারণ তারা সেনাপ্রধানের এই অবাধ্যতার বিরোধিতা করেছিলেন।
সেনাবাহিনীকে ঢাকায় মার্চ করার নির্দেশ
২০শে মে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয় যখন জেনারেল নাসিম বিভিন্ন ডিভিশনের এরিয়া কমান্ডারদের প্রতি নির্দেশনা জারি করেন এবং প্রতি ডিভিশন থেকে এক ব্রিগেড সৈন্য ঢাকায় প্রেরণের আদেশ (মুভ অর্ডার) দেন। ময়মনসিংহ থেকে ব্রিগেডিয়ার জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে এবং বগুড়া থেকে ব্রিগেডিয়ার শফি মাহবুবের নেতৃত্বে দুটি পৃথক ব্রিগেড গ্রুপ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যশোর সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম সেনাপ্রধানের অনুগত হলেও, তিনি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তার ব্যাটালিয়নকে সেনানিবাসের ভেতরেই আটকে রাখেন এবং কোনো সৈন্য বাইরে পাঠাননি। বিভিন্ন তথ্যমতে, এই মার্চ-অর্ডারের মূল উদ্দেশ্য ছিল রেডিও-টেলিভিশন স্টেশন দখল এবং বঙ্গভবন ঘেরাও করে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা।
যেভাবে প্রতিহত করা হয়েছিল সেই অভ্যুত্থান চেষ্টা
সেনাপ্রধানের এই রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক পদক্ষেপের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যান সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান এবং কুমিল্লার ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন। তারা রাষ্ট্রপতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেন।
তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে জানান, সেনাপ্রধান যখন তাকে সৈন্য নিয়ে ঢাকায় ঢোকার নির্দেশ দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রপতি তাকে ফোন করে সরাসরি নির্দেশ দেন, “ঢাকাতে সমাবেশ করবা না। ঢাকা অভিমুখে বাইরে থেকে যেসব সৈন্যরা আসে তাদেরকে প্রতিরোধ করো।”
রাষ্ট্রপতির নির্দেশ পাওয়ার পরপরই সাভার সেনানিবাসের এক ব্রিগেড সৈন্য ময়মনসিংহের বাহিনীকে গাজীপুরের শ্রীপুরে আটকে দেয়। অন্যদিকে বগুড়া থেকে আসা সেনাদলকে ঠেকাতে পদ্মা নদীর সব ফেরি আরিচাঘাটে এনে জড়ো করা হয় এবং যমুনা নদীর পাড়জুড়ে ভারী মেশিনগান ও মর্টার স্থাপন করা হয়। একই সাথে কুমিল্লা থেকে আসা একটি ব্রিগেড ঢাকা আর্মি স্টেডিয়াম ও মাওয়া ঘাটে অবস্থান নেয়। সাভার থেকে আসা ১০টি ট্যাঙ্ক বঙ্গভবন রক্ষা এবং আরও ১০টি ট্যাঙ্ক ঢাকা সেনানিবাস কর্ডন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিকেল ৫টার মধ্যে পুরো ঢাকা শহর কৌশলগতভাবে সুরক্ষিত করা হয়।
থমথমে ঢাকা এবং সেনাপ্রধানের বাধ্যতামূলক অবসর
সেনাবাহিনীর এই মুখোমুখি অবস্থানের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো ঢাকা শহরে চরম আতঙ্ক বিরাজ করে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায় এবং দোকানপাট বন্ধ হয়ে পড়ে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের গোলাগুলি বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিকেল ৩টার দিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং জেনারেল মাহবুবকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। বিকেল সাড়ে ৫টায় রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে জেনারেল নাসিমের এই আচরণকে ‘সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
একই দিন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানও জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। পরবর্তীতে সেনাসদরে কার্যত বন্দী অবস্থায় লে. জেনারেল নাসিম বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার এই অবসরকে ‘অবৈধ আদেশ’ বলে দাবি করেছিলেন। এই ঘটনার মাত্র ২২ দিন পর, ১২ই জুন দেশে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
জাতীয় ও ইতিহাস ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ