৯ বছর পর বেইজিংয়ে ট্রাম্প: বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ও একুশ শতকের স্নায়ুযুদ্ধ
দীর্ঘ ৯ বছরের দীর্ঘ বিরতি এবং বিশ্ব রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় পরিবর্তনের পর অবশেষে তিন দিনের এক মেগা রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (১৩ মে) সকালে বেইজিং ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ট্রাম্পকে বহনকারী ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ অবতরণ করার পর তাকে অভূতপূর্ব লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে তার প্রথম মেয়াদে চীন সফরের পর এটিই তার প্রথম বেইজিং সফর, যা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সফর নয়, বরং বিশ্ব ব্যবস্থার নতুন কোনো সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কর্পোরেট কূটনীতি ও টেক জায়ান্টদের উপস্থিতি:
ট্রাম্পের এবারের সফরের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তার সফরসঙ্গীদের তালিকা। কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল নয়, বরং আমেরিকার প্রভাবশালী সব ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিবিদদের একটি ‘পাওয়ার প্যাকড’ দল তার সঙ্গে রয়েছে। এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন অ্যাপল-এর টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এবং বিশ্বের বৃহত্তম অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক। এছাড়াও গুগল ও মাইক্রোসফটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই সফরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গী হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও চীনের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলা ‘চিপ ওয়ার’ বা প্রযুক্তি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন হয়তো চীনের বিশাল বাজারের সাথে নতুন করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে।
আলোচনার টেবিলে জ্বলন্ত ইস্যু—তাইওয়ান ও ইরান:
সফরের আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনার আড়ালে রয়েছে অত্যন্ত কঠিন ও স্পর্শকাতর সব ভূ-রাজনৈতিক সংকট। হোয়াইট হাউস সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আলোচনার শীর্ষে থাকবে তাইওয়ান ইস্যু। দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান এই অঞ্চলে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত করছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে চীনের ভূমিকা নিয়েও কঠোর দরকষাকষি হতে পারে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আলোচনায় সমঝোতা না হলে দুই পরাশক্তির মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এক নতুন চরম সীমায় পৌঁছাতে পারে।
পরিবর্তিত চীন ও ‘নতুন উৎপাদন শক্তি’:
২০১৭ সালের সফরের তুলনায় ২০২৬ সালের চীন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। গত ৯ বছরে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতাকে অবিশ্বাস্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘নিউ প্রোডাক্টিভ ফোর্সেস’ বা নতুন উৎপাদন শক্তির ওপর ভিত্তি করে দেশটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, রোবটিক্স এবং গ্রিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্প যখন ওয়াশিংটনে শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছেন, বেইজিং তখন হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্পের এই সফরে বেইজিংয়ের এই পরিবর্তিত শক্তি এবং মার্কিন স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে দুই নেতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঝংনানহাইয়ে রাজকীয় অভ্যর্থনা:
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘নিষিদ্ধ নগরী’ বা ফরবিডেন সিটি সংলগ্ন ঝংনানহাই এলাকায় এক বিরল ভোজসভার আয়োজন করেছেন। এর আগে ২০১৭ সালে ট্রাম্পকে যে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়েছিল, এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ কূটনীতির নেপথ্যে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ভর করছে এই সফরের শেষ দিন অর্থাৎ আগামী শুক্রবারের ওপর।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ