শি জিনপিংয়ের সফরের মুখে উত্তর কোরিয়ার ১০ হাজার টনের ডেস্ট্রয়ার তৈরির ঘোষণা
পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনে কিম জং উনের নতুন যুদ্ধজাহাজ ও গোপন নৌ-অস্ত্রের মহাপরিকল্পনা; দীর্ঘ ৭ বছর পর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
ঢাকা: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরের ঠিক আগমুহূর্তে ১০ হাজার টন ওজনের একটি দানবীয় ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) তৈরি এবং সমুদ্রের তলদেশে অত্যন্ত শক্তিশালী ও গোপন অস্ত্র উন্নয়নের এক চাঞ্চল্যকর মহাপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে উত্তর কোরিয়া। আজ শনিবার (৬ জুন) দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘রোদং সিনমুন’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশন’-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হং মিন এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়ার সামরিক ইতিহাসে এই প্রথমবার তারা প্রকাশ্যে ১০ হাজার টন ওজনের কোনো ডেস্ট্রয়ার বা বিশাল আকৃতির অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনার কথা বিশ্ববাসীর সামনে আনল। আগামী সোম ও মঙ্গলবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফরের কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার এই ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগেই উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন পিয়ংইয়ংয়ের আকাশছোঁয়া সামরিক ও নৌ সক্ষমতা প্রদর্শন করে নিজেদের শক্তি ও একচ্ছত্র আধিপত্যের জানান দিতে চাইছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রত্যক্ষ তদারকি ও নির্দেশনায় দেশটিতে একটি বড় ধরনের নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ওই মহড়া পরিদর্শন শেষে কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে যত দ্রুত সম্ভব ‘ক্যাং কন’ এবং ‘চোয়ে হিয়ন’ নামের দুটি ৫ হাজার টনের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ যুদ্ধের ময়দানে মোতায়েন করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেন। রোদং সিনমুনের খবরে কিম জং উনের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ এড়াতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পিয়ংইয়ংকে অবশ্যই তাদের নৌ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জল, স্থল ও আকাশ—এই তিন বিভাগেই উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে যেকোনো শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য চূড়ান্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর এটিই হতে যাচ্ছে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর, যা এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শি জিনপিংয়ের সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার ঠিক আগেই, গত বৃহস্পতিবার কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার একটি নতুন চালু হওয়া পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অস্ত্রের বহর বহুগুণে বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীদের প্রতি বিশেষ তাগিদ দেন। শনিবার রোদং সিনমুনে প্রকাশিত একটি বিশেষ ছবিতে দেখা যায়, যুদ্ধজাহাজ ও নৌ-মহড়া পরিদর্শনের সময় কিম জং উনের সাথে তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আলোচিত কিশোরী মেয়ে জু এ-ও উপস্থিত ছিল, যা দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে, উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের যাত্রাটি বেশ কিছু নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছে। বিগত ২০২৫ সালের মে মাসে উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানিয়েছিল যে, চংজিন বন্দরে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময় তাদের নবনির্মিত ৫ হাজার টন ওজনের একটি ডেস্ট্রয়ার ভারসাম্য হারিয়ে আংশিকভাবে সাগরে উল্টে গিয়েছিল। কিম জং উন স্বয়ং সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান তদারকি করছিলেন এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর তিনি তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে একে ‘অমার্জনীয় অপরাধমূলক কাজ’ বলে সামরিক কর্মকর্তাদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে রাজিন বন্দরে এনে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি নিখুঁতভাবে মেরামত করা হয় এবং পরবর্তী মাসেই এর দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হয়। ওই সময়ই এই শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় ‘ক্যাং কন’। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে চীনের সমর্থন ধরে রাখা এবং নিজেদের ১০ হাজার টনের ডেস্ট্রয়ার তৈরির এই নতুন ঘোষণা কোরিয়া উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনার পারদকে আরও বাড়িয়ে দিল।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ