ব্যবসায়িক বাধা দূর করতে বাজেটে বড় শুল্ক ও কর সংস্কারের উদ্যোগ
ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন ও দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সুসংবাদ; ‘নো ইমপোজিশন, অনলি ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ নীতিতে হাঁটছে এনবিআর।
ঢাকা: দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি সচল রাখতে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর নিয়ে আসছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন কোনো অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) কমানো এবং ‘ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ বা বাণিজ্য সহজীকরণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে একগুচ্ছ যুগান্তকারী সংস্কার পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে। এনবিআর-এর উচ্চপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, এবারের বাজেট মূলত ‘নো ইমপোজিশন, লিটল এক্সেম্পশন—অনলি ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ (নতুন কর আরোপ নয়, সামান্য রেয়াত—কেবলই বাণিজ্য সহজীকরণ) এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সাজানো হচ্ছে, যা দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ভ্যাট ও শুল্ক সংস্কারের সবচেয়ে বড় চমক থাকছে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়মে। বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হলেও, আসন্ন বাজেটে এটিকে ত্রৈমাসিক বা তিন মাস পর পর জমা দেওয়ার ঐতিহাসিক সুবিধা চালু করা হতে পারে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের বছরে ১২টি জটিল রিটার্ন দাখিলের পরিবর্তে মাত্র ৪টি রিটার্ন জমা দিলেই চলবে। এনবিআর-এর এই সিদ্ধান্তের ফলে মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া দেশের প্রায় ৫ লাখ ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান সরাসরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পাবে। এর পাশাপাশি অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড করার বিধান আসছে, যেখানে কোনো ভ্যাট কর্মকর্তার ম্যানুয়াল বা ব্যক্তিগত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে না। এছাড়া যেসব আধুনিক প্রতিষ্ঠান এনবিআর অনুমোদিত এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাট রিটার্ন ও অডিট-সংক্রান্ত নথিপত্রের হার্ড কপি বা কাগজের নথি জমা দেওয়ার দীর্ঘদিনের বাধ্যতামূলক নিয়মটি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা পূর্ণাঙ্গ পেপারলেস কর ব্যবস্থার দিকে একটি বড় ধাপ।
ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় স্বস্তির জায়গা হতে যাচ্ছে দেশের বন্দরগুলোতে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স বা পণ্য খালাসের সময়সীমা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা। বর্তমানে আমদানি করা শিল্প কাঁচামাল বা রাসায়নিকের নমুনা পরীক্ষার শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা কেবল বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে পরীক্ষা করা যায়, যার কারণে ঢাকার ল্যাবে নমুনা পাঠাতে এবং চূড়ান্ত রিপোর্ট পেতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমনাদানিকারকদের বন্দরে বিপুল পরিমাণ ডেমারেজ চার্জ বা জরিমানা গুনতে হয়। আসন্ন বাজেটে এই জটিলতা দূর করতে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও) সার্টিফায়েড এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) অনুমোদিত দেশের যেকোনো বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত ল্যাবরেটরিতেও এই নমুনা পরীক্ষার আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বস্ত আমদানিকারকদের জন্য ২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর’ (এইও) বা ট্রাস্টেড ট্রেডার সনদ পাওয়ার কঠিন শর্তগুলো শিথিল করা হচ্ছে, যাতে আরও বেশি কোম্পানি বন্দরে কোনো ফিজিক্যাল বা কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি নিজস্ব গুদামে পণ্য নিয়ে যেতে পারে। একই সাথে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনে কাঁচামালের অনুপাত নির্ধারণকারী ‘ইনপুট-আউটপুট কো-এফিশিয়েন্ট’ ঘোষণার বিদ্যমান জটিল শর্তগুলোও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআর-এর এই ঐতিহাসিক সংস্কার ভাবনাকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং দূরদর্শী বলে স্বাগত জানিয়েছেন। বহুল সমালোচিত ‘মিনিমাম ট্যাক্স’ বা ন্যূনতম কর ব্যবস্থা থেকে এনবিআর-এর সরে আসার ইঙ্গিতকে সাধুবাদ জানিয়ে নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, ভ্যাট ও কাস্টমস সংস্কারের এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে তা সত্যিকারের বাণিজ্য সহজীকরণে ভূমিকা রাখবে। তবে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়ে বলেন, নমুনা পরীক্ষা চলাকালীন বন্দরে কনসাইনমেন্ট বা চালানের পণ্য আটকে না রেখে তা শর্তসাপেক্ষে খালাসের অনুমতি দেওয়া উচিত। কারণ ল্যাবের রিপোর্টের জন্য ১৫ দিন পণ্য বন্দরে পড়ে থাকায় চার দিন পর থেকেই ডেমারেজ শুরু হয়, যার কারণে তাদের কোম্পানির মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা কেবল জেটি ভাড়ার পেছনেই নষ্ট করতে হয়। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বর্তমান ভীতিমূলক ও অতিরিক্ত কর আদায়ের ব্যবস্থার কারণে নতুন বিনিয়োগ আসছিল না, তাই বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটলে দেশের শিল্প খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান এবং অন্তর্বর্তীকালীন রাজস্ব সংস্কার কমিটির প্রধান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বিষয়টিকে অর্থনীতির জন্য একটি অবিকল্প পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ বা সহজ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সামষ্টিক অর্থনীতি সচল থাকবে না, আর অর্থনীতি সচল না থাকলে রাজস্ব আদায়ও স্থবির হয়ে পড়বে। ভয় দেখিয়ে বা করদাতাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করে কখনোই টেকসই উপায়ে রাজস্ব বাড়ানো যায় না। আসন্ন বাজেটে অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় ব্যক্তি ও কোম্পানিভিত্তিক করদাতাদের জন্য নতুন ঘোষিত করহার পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য অপরিবর্তিত ও নির্দিষ্ট রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কথা আসতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি পূর্বাভাসযোগ্য স্থিতিশীল কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের দেওয়া আশ্বাসের ভিত্তিতে এই ব্যবসাবান্ধব বাজেট চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সচল রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ