রামগতিতে শিশু নিপীড়নের সালিশে বিএনপি নেতাকে ‘৩ থাপ্পড়’ মেরে ‘বিচার’ সম্পন্ন, পরিবার ঘরছাড়া
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সাড়ে তিন বছরের এক কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে সালিশি বৈঠকে নামমাত্র শাস্তি দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত পৌর ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সেক্রেটারি মো. বেলালের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ‘আইনে বেত্রাঘাতের বিধান নেই’—এমন অজুহাতে সালিশে তাকে পিঠে তিনটি থাপ্পড় মেরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে ঘটনার পর থেকে মামলা তুলে নেওয়ার অব্যাহত হুমকিতে ভুক্তভোগী পরিবারটি বর্তমানে নিজেদের ঘর ছেড়ে ফেরারি জীবন যাপন করছে।
ঘটনার বিবরণ ও মামলা দায়েরের চেষ্টা
গত ১৭ মে রামগতি পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশুটিকে বাদামের প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যান একই ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. বেলাল এবং সেখানে শিশুটির ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়। শিশুটি বাড়িতে ফিরে মায়ের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। ঘটনার সময় শিশুটির পিতা কর্মসূত্রে কক্সবাজারে ছিলেন। তিনি বাড়ি ফিরে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কাছে বিচার দাবি করলে তারা নানা উছিলায় সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে পরিবারটি উপজেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে রামগতি থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। তবে অভিযোগ করার পরও পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় তদন্তের গতি থমকে যায় বলে দাবি পরিবারের।
সালিশি বৈঠক ও বিতর্কিত ‘৩ থাপ্পড়’ দণ্ড
থানায় অভিযোগের পর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে গত ৩১ মে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুর্তজা আল আমিনের নেতৃত্বে স্থানীয়ভাবে এক সালিশি বৈঠক বসে। সালিশে উপস্থিত থাকা প্রত্যক্ষদর্শী শহীদুল ইসলাম খোকন জানান, বৈঠকে প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল অভিযুক্ত বেলালকে কান ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হবে এবং ১০টি বেত্রাঘাত করা হবে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রীয় আইনে বেত দেওয়ার বিধান না থাকায়’ সালিশের বিচারক আল-আমিন কমিশনার অভিযুক্তের পিঠে তিনটি চড়-থাপ্পড় মেরে এবং বাদীপক্ষের কাছে মাফ চাইয়ে বিচার সম্পন্ন ঘোষণা করেন।
হুমকি ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা
আদালত বা প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে এই স্পর্শকাতর অপরাধের প্রহসনমূলক বিচার করার পর থেকেই ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর নেমে এসেছে চরম মানসিক ও সামাজিক চাপ। শিশুর বাবা মো. রুবেল অভিযোগ করেন, সালিশের পরপরই স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র থানা থেকে অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য তাদের ক্রমাগত চাপ ও হুমকি দিচ্ছে। চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের মুখে তারা বর্তমানে নিজ বাড়ি ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিএনপি নেতৃত্ব ও থানা পুলিশের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামগতি পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আল আমিন জানান, ভুক্তভোগী অত্যন্ত ছোট শিশু হওয়ায় ঘটনার গভীরতা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে এবং ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। তবে ‘ব্যাড টাচ’ বা খারাপ ইঙ্গিতের সত্যতা মেলায় সামাজিকভাবে তাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পরবর্তীতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, এই স্পর্শকাতর বিষয়ে রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি দাবি করেছেন, এই ঘটনায় থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি এবং পুরো বিষয়টি স্থানীয়ভাবেই মীমাংসা করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ