বদলে গেল কোষ বিভাজনের শতবর্ষী নিয়ম

admin

June 4, 2026

বদলে গেল কোষ বিভাজনের শতবর্ষী নিয়ম

জার্মানির ড্রেসডেন ইউনিভার্সিটির ‘ফিজিকস অব লাইফ ক্লাস্টারের’ একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি কোষ বিভাজনের সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্ময়কর এক কৌশল আবিষ্কার করেছেন, যা জীববিজ্ঞানের শতবর্ষী পুরোনো তত্ত্বকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করে। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ (Nature)-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাটিপাস, হাঙর কিংবা পাখির মতো ডিম পাড়া প্রাণীদের বিশাল ভ্রূণকোষের বিভাজন প্রক্রিয়া এতদিনের চেনা ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

সাধারণত বিজ্ঞানের পাঠ্যবই অনুযায়ী, কোষ বিভাজনের সময় তার ঠিক মাঝখানে ‘অ্যাকটিন’ নামক প্রোটিনের একটি আংটি বা রিং তৈরি হয়। এটি অনেকটা প্যান্টের ফিতার মতো চারপাশ থেকে চেপে ধরে কোষটিকে মাঝখান থেকে দুভাগে বিভক্ত করে ফেলে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘পার্স স্ট্রিং মডেল’। তবে ডিমের ভ্রূণকোষগুলো আকারে সাধারণ কোষের চেয়ে অনেক বড় হয় এবং এগুলোর ভেতর বিশাল আকৃতির কুসুম থাকে। কোষের আকার অতিরিক্ত বড় হওয়ায় অ্যাকটিন প্রোটিনের তৈরি সেই রিংটি পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে না। ফলে এই বিশাল কোষগুলো কীভাবে সফলভাবে বিভক্ত হয়, তা এতদিন বিজ্ঞানীদের কাছে এক গভীর রহস্য ছিল।

এই রহস্য উদ্ঘাটনে গবেষক দলের প্রধান অ্যালিসন কিকুথ দ্রুত বর্ধনশীল জেব্রাফিশের ভ্রূণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণাগারে তিনি লেজার রশ্মি ব্যবহার করে কোষের সেই অ্যাকটিনের ফিতাটি মাঝখান থেকে কেটে দেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, ফিতাটি কেটে যাওয়ার পরও তা সংকুচিত হয়ে ভেতরের দিকেই এগোতে থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, কোষের কঙ্কাল বা ‘সাইটোস্কেলিটন’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মাইক্রোটিবিউল’ এই ফিতাকে চারপাশ থেকে যান্ত্রিক খুঁটি হিসেবে ধরে রাখে। রাসায়নিক ও ক্ষুদ্র তেলের বিন্দু ব্যবহার করে মাইক্রোটিবিউলের কাজে বাধা দেওয়া হলে অ্যাকটিনের ফিতাটি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ, বড় কোষ বিভাজনে মাইক্রোটিবিউল অন্যতম প্রধান মেকানিক্যাল সাপোর্ট বা যান্ত্রিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞানীরা কোষের ভেতর চৌম্বকীয় পুঁতি ঢুকিয়ে কোষ বিভাজনের দুটি প্রধান ধাপ—ইন্টারফেজ এবং এম-ফেজ-এর মধ্যে একটি অদ্ভুত মেকানিজম দেখতে পান। ইন্টারফেজ দশায় কোষের ভেতরের জেলি বা সাইটোপ্লাজম বেশ শক্ত হয়ে যায়, যা অ্যাকটিনের ফিতাকে শক্তভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে। আর এম-ফেজ দশায় সাইটোপ্লাজম পুরোপুরি তরল হয়ে যায়, যাতে ফিতাটি সহজেই ভেতরের দিকে ঢুকতে পারে। তরল দশায় ফিতাটি ধসে পড়ার উপক্রম হলেও ভ্রূণকোষের বিভাজন এত দ্রুত ঘটে যে, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আগেই কোষটি আবার ইন্টারফেজ দশায় ফিরে যায় এবং সাইটোপ্লাজম শক্ত হয়ে ফিতাটিকে আটকে ফেলে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি মেকানিকদের ব্যবহৃত ‘র‍্যাচেট টুলের’ (Ratchet Tool) মতো কাজ করে, যা এক টানের বদলে ধাপে ধাপে আটকে আটকে এগিয়ে যায়।

এই গবেষণার অন্যতম লেখক জ্যান ব্রুগেস জানান, এই র‍্যাচেট কৌশলটি কোষ বিভাজন নিয়ে আমাদের এতদিনের সনাতন ধ্যানধারণা এবং চেনা হিসাবনিকাশ একেবারেই পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার কেবল জেব্রাফিশ নয়, বরং ডিম পাড়া সব প্রাণীদের ভ্রূণবিকাশের রহস্য উন্মোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে অদূর ভবিষ্যতে স্কুল-কলেজের জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের পাতাও নতুন করে লিখতে হতে পারে।

বিজ্ঞান ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ