গ্যাস সংযোগের অভাবে অলস ৩৫ হাজার কোটির শিল্প বিনিয়োগ, চরম সংকটে উদ্যোক্তারা
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, বাংলাদেশ: দেশে একের পর এক অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলেও কেবল গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না শত শত মেগা কারখানা। অবকাঠামো নির্মাণ ও বিপুল অর্থায়ন সম্পন্ন হওয়ার পরও সংযোগ না পেয়ে দেশের বেসরকারি খাতের অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সম্পূর্ণ অলস বসে আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-এর এক অনুসন্ধানে দেশের শিল্প খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস সংযোগের জন্য বর্তমানে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিতে প্রায় ১,৮০০টি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৫৫০টি শিল্প ইউনিট ডিমান্ড নোটের কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করার পরও গত চার-পাঁচ বছর ধরে সংযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। অন্যদিকে, কারখানা চালু না হওয়ায় কোনো ধরনের রাজস্ব বা আয় ছাড়াই ব্যাংক ঋণের মোটা অঙ্কের কিস্তি ও সুদের টাকা গুনতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের, যা পুরো উৎপাদন খাতে মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয় ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস সংকটে স্থবির দেশের শীর্ষ মেগা প্রকল্পসমূহ
মুন্সিগঞ্জের হোসন্দি ইকোনমিক জোনে প্রায় ১১,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি বড় শিল্প ইউনিট স্থাপন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ কনগ্লোমারেট সিটি গ্রুপ। ২০১৮ ও ২০২১ সালে তিতাস গ্যাসকে ১৫০ কোটি টাকা সিকিউরিটি ডিপোজিট দেওয়ার পরও আজ পর্যন্ত কোনো গ্যাস সংযোগ মেলেনি। ফলে বিপুল এই বিনিয়োগ থেকে কোনো রিটার্ন না আসায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধে অন্য সচল ব্যবসা থেকে অর্থ ডাইভার্ট করতে হচ্ছে, যা গ্রুপটির ওয়ার্কিং ক্যাপিটালে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
একই দশা আরেক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের। নারায়ণগঞ্জে মেঘনা ইকোনমিক জোনে ৳৬,০০০ কোটি এবং কুমিল্লা ইকোনমিক জোনে ৳১০,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ স্রেফ গ্যাসের অপেক্ষায় আটকে আছে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, ২০২২ সাল থেকে স্টিল, গ্লাস ও পেপারবোর্ড ফ্যাক্টরি রক্ষণাবেক্ষণ করতেই বছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে ১০০ কোটি টাকা গ্রিড আপগ্রেড এবং ১০০ কোটি টাকা জিটিসিএল পাইপলাইন নির্মাণেও কোনো সুফল মেলেনি।
এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ৫,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি আব্দুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেবল হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড আংশিক উৎপাদনে যেতে পেরেছে। বাকি সব কারখানা বন্ধ থাকায় গ্রুপটি তীব্র আর্থিক চাপে পড়ে ইতিমধ্যে তাদের একটি sugar mill বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে বসুন্ধরার ১,০২৩ কোটি টাকার তেল ও বীজ মাড়াই প্ল্যান্ট এবং চট্টগ্রামে টিকে গ্রুপের মেগা স্টিল মিল ২০২২ সাল থেকে প্রস্তুত হয়ে থাকলেও পেট্রোবাংলা বা তিতাস গ্যাস সংযোগ দিতে পারেনি।
सरकारी অর্থনৈতিক অঞ্চলেও একই স্থবিরতা
২০১১ সালে সরকার সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার লক্ষ্যমাত্রা নিলেও পর্যাপ্ত ইউটিলিটি বা গ্যাসের অভাবে একটিও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। দেশের বৃহত্তম মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে (৩৫,০০০ একর) ৪১টি সংস্থাকে ২৪৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও গ্যাস ও পানির অভাবে মাত্র ৩টি ইউনিট উৎপাদনে যেতে পেরেছে। জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১.৭৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব থাকলেও গ্যাস সংকটে মাঠপর্যায়ে বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ২১৬ মিলিয়ন ডলার। একই দশা সিরাজগঞ্জ ও সাবরাং ট্যুরিজম পার্কেও।
বিকল্প জ্বালানির আকাশচুম্বী খরচ
স্পিনিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, টেক্সটাইল, cement, সিরামিক ও ফুড প্রসেসিং কারখানায় উচ্চ তাপ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ (ক্যাপটিভ পাওয়ার) নিশ্চিত করতে গ্যাসের কোনো সহজ বিকল্প নেই। গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ ২ থেকে ৩ গুণ বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধ্বংস করে দেবে। এছাড়া এলপিজি (LPG) দিয়ে এত বড় শিল্প স্কেলে উৎপাদন পরিচালনা করা ব্যয়বহুল ও সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সংকটের মুখে নীতি নির্ধারক ও ব্যবসায়ীরা
সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা পর্বে সঠিক ফিজিবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট বা উপযোগিতা যাচাই করা হয়নি। একসাথে এতগুলো জোনের অনুমোদন দেওয়া ঠিক হয়নি। এখন ব্যবসার খরচ কমানো এবং গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট দূর করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু স্বীকার করেছেন যে, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। এই বিপুল ঘাটতির কারণেই শিল্প সংযোগ আটকে রাখার পাশাপাশি সার কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও পর্যায়ক্রমে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও করপোরেট ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ