কারিনা কায়সারের মৃত্যু নিয়ে অনলাইনে আওয়ামী সমর্থকদের অরুচিকর উল্লাস: তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ
তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক নজিরবিহীন ও অসংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। লিভার ও ফুসফুসের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩০ বছর বয়সে মারা যান তিনি। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের একাংশ তাঁর এই মৃত্যুকে নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্য এবং ট্রলিংয়ে মেতে উঠেছে। এই ন্যাক্কারজনক সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের বিশিষ্টজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক তারকা খেলোয়াড় কায়সার হামিদের কন্যা কারিনা কায়সার ডিজিটাল মাধ্যমে একজন প্রতিভাবান কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনয়শিল্পী হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। অসুস্থতা মারাত্মক রূপ নিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রেশার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কারিনা কায়সার রাজপথে নেমে সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে রাজনৈতিক যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, কারিনার মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে তার এক নির্মম ও অমানবিক রূপ দেখা গেল। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সমর্থক আইডি ও পেজ থেকে তাঁর পুরোনো ছবি শেয়ার করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হচ্ছে, যা স্পষ্টত সাইবার হ্যারাসমেন্ট বা অনলাইনের মাধ্যমে হয়রানির শামিল। এমনকি কোনো কোনো মহল থেকে এই অকাল মৃত্যুকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার নোংরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কারিনা কায়সারের মৃত্যু নিয়ে এমন অসংবেদনশীল ও নেতিবাচক প্রচারণার বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছেন, “কিছু লোক শুধু মানুষ হত্যার জন্যই বিখ্যাত নয়, মানুষের মৃত্যুতে উল্লাস করবার জন্যও বিখ্যাত।” অন্যদিকে, বিশিষ্ট অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট দেবাশীষ চক্রবর্তী এই সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে লিখেছেন, মানুষের মৃত্যু নিয়ে এমন কুৎসিত উদযাপন ভবিষ্যতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও বেশি বিষাক্ত করে তুলবে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মৃত্যুর মতো একটি চূড়ান্ত ও শোকাবহ বিষয়েও রাজনৈতিক মতাদর্শকে টেনে এনে উপহাস করা সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম লক্ষণ। যেকোনো মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করা সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই নোংরা উদযাপনের সংস্কৃতি সাধারণ নাগরিকদের মাঝে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ নেটিজেনরা অবিলম্বে এই ধরনের ঘৃণ্য সাইবার বুলিং ও অপপ্রচার বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
জাতীয় ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ