কক্সবাজারে সেনা কর্মকর্তা তানজিম হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: ৪ ডাকাতের মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন
কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় নির্মমভাবে শহীদ হওয়া সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট মো. তানজিম ছারোয়ার নির্জন (২৩) হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে ৪ জন ডাকাতকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, একই ঘটনায় দায়ের করা পৃথক অস্ত্র মামলায় ১৩ আসামিকে ১৭ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অন্যদিকে, উভয় মামলায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ৫ জনকে সসম্মানে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (২০ মে) দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-৫ম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী জনাকীর্ণ আদালতে এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) খোরশেদ আলম চৌধুরী ও বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, রায় ঘোষণার সময় মামলার ১৩ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং আবদুল করিম নামে এক আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আজ সকাল ১১টার দিকে কড়া নিরাপত্তায় কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে ১২ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে বেলা সোয়া ১২টার দিকে আইনি শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক প্রথমে ডাকাতি ও হত্যা মামলার রায় এবং পরবর্তীতে পুলিশের দায়ের করা অস্ত্র মামলার রায় পড়ে শোনান।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৪ আসামি হলেন:
১. মো. হেলাল উদ্দিন (চকরিয়ার পূর্ব ডুমখালী)
২. নুরুল আমিন (রিংভং এলাকা)
৩. মো. নাছির উদ্দিন (পূর্ব ডুমখালী)
৪. মোর্শেদ আলম (পূর্ব ডুমখালী)
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ আসামি হলেন:
জামাল উদ্দিন বাবুল, মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, মোহাম্মদ আনোয়ার হাকিম, জিয়াবুল করিম, মো. ইসমাইল হোসেন, এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, মোহাম্মদ এনাম, মো. কামাল এবং আবদুল করিম (পলাতক)।
আদালতের রায়ে সম্পূর্ণ খালাস পেয়েছেন: মো. ছাদেক, আনোয়ারুল ইসলাম, শাহ আলম, আবু হানিফ ও মিনতাজ উদ্দিন।
প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে ডাকাত দলের উপস্থিতি এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে ডাকাতদলের সদস্যরা দিকবিদিক পালাতে শুরু করলে অসীম সাহসী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মো. তানজিম ছারোয়ার নির্জন তাদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে ডাকাতরা চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরে ছুরিকাঘাত করলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশের এই বীর সন্তান শাহাদাত বরণ করেন।
মামলা ও তদন্তের বিবরণ
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরদিন (২৫ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে সেনাবাহিনীর ফাঁসিয়াখালী ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ডাকাতি ও হত্যা মামলা এবং চকরিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পুলিশ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। আদালত সকল আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ শেষে আজ এই রায় ঘোষণা করলেন।
শহীদ লেফটেন্যান্ট তানজিমের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) থেকে আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেছিলেন। তরুণ এই সেনা কর্মকর্তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। আজকের এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন ও আদালত ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ