এমপিদের সরাসরি উন্নয়ন তহবিল বাতিল করে পিএমও-র অধীনে বিশেষ সেল গঠন

admin

June 7, 2026

এমপিদের সরাসরি উন্নয়ন তহবিল বাতিল করে পিএমও-র অধীনে বিশেষ সেল গঠন

বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করতে সংসদ সদস্যদের (এমপি) সরাসরি থোক বরাদ্দ বা এলাকা উন্নয়ন তহবিল দেওয়ার দীর্ঘদিনের নিয়ম বাতিল করেছে সরকার। এখন থেকে এমপিরা তাদের নিজ এলাকার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দিতে পারলেও, সেই তহবিলের ওপর তাদের কোনো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) অধীনে একটি শক্তিশালী ও ডেডিকেটেড সেল গঠন করা হয়েছে, যা এই প্রকল্পগুলো কঠোরভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে এই সেলটি পরিচালিত হবে এবং তার অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এই সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এমপিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের প্রত্যাশিত উন্নয়ন কর্মসূচি দ্রুত, কার্যকর ও সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই সেল গঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘অগাধিকারভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর অধীনে প্রতি বছর একজন এমপিকে নিজ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হতো। সিটি কর্পোরেশন এলাকার ২০ জন এমপি ছাড়া বাকি ২৮০ জন নির্বাচিত এমপি ৫ বছরের সংসদীয় মেয়대에 মোট ২৫ কোটি টাকা করে পেতেন। এই বিপুল অর্থ মূলত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর মাধ্যমে এমপিদের নিজেদের একক সিদ্ধান্তে রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট, হাটবাজার ও খেয়াঘাট নির্মাণে খরচ হতো। এই ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও এমপিদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের মাধ্যমে অর্থ লোপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রথমবার সরকার গঠনের পর ৫ বছরের জন্য প্রতি এমপি ১৫ কোটি টাকা করে পেয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়েছিল। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বরাদ্দ বাড়িয়ে বার্ষিক ৫ কোটি টাকা করা হয়, যা বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোপুরি বাতিল করল।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এমপিরা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা এলাকার প্রয়োজনে যেসব প্রকল্প প্রয়োজন মনে করবেন, তা লিখিতভাবে এই সেলের কাছে জমা দেবেন। তবে প্রস্তাব করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হবে না। প্রকল্পগুলোকে অবশ্যই সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইতিমধ্যে এই সেল পরিচালনার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ডoperating প্রসিডিউর (SOP) বা কার্যপ্রণালী বিধি তৈরি করেছে। সেল থেকে কোনো প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপের কথা জানাতে হবে। যদি কোনো প্রকল্প অবাস্তব বা অযোগ্য মনে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ সেলকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। সেল কর্তৃক অনুমোদিত প্রকল্পগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলো বাস্তবায়ন করবে এবং প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে এই বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন বাধ্যতামূলকভাবে পিএমও সেলে জমা দিতে হবে। মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি বাধা তৈরি হলে, এই বিশেষ সেল সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তা দ্রুত সমাধান করবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে এমপিদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি ও প্রস্তাবিত প্রকল্প সংরক্ষণ করা হবে। কোনো প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বেশ কিছু কঠোর শর্ত যাচাই করা হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, প্রকল্পটি দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে কতটা ভূমিকা রাখবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন চলাকালীন ও বাস্তবায়নের পর স্থানীয় মানুষের জন্য সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না। এছাড়া স্থানীয় কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়নের পাশাপাশি নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এই প্রকল্প থেকে কতটা উপকৃত হবেন, তাও খতিয়ে দেখা হবে। একই এলাকায় সরকারের অন্য কোনো স্কিমের অধীনে সমজাতীয় কাজ চলমান থাকলে, এমপিদের প্রস্তাবিত সেই প্রকল্প সরাসরি বাতিল করা হবে।

সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে এমপিদের সরাসরি তহবিল দেওয়ার কারণে উন্নয়নের নামে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে তিনি একটি বড় সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন করা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা নয়। এই সংস্কারের আসল সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পর্যায়কে পুরোপুরি দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর। প্রকল্পের সমস্ত কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া অবশ্যই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (PPA) বা সরকারি ক্রয় আইন মেনে করতে হবে। যদি স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মী ও ক্যাডারদের ঠিকাদারি বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বন্ধ না করা যায়, তবে এই ভালো উদ্যোগটিও শেষ পর্যন্ত ‘পুরানো মদ নতুন বোতলে’ নেওয়ার মতো রূপ পাবে এবং আগের অনিয়মগুলোরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক সুবিধা ও ভিআইপি কালচার বন্ধে একের পর এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর আগে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সুবিধাও বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকারের সংসদীয় দল, যা আগামী জাতীয় বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই বিশেষ সেল আগামীতে সফলভাবে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর ‘সাকসেস স্টোরি’ ও জনকল্যাণের প্রকৃত ইমপ্যাক্ট রিপোর্টও নিয়মিত প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে।

RDM News 24 | ঢাকা

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ