বাংলাদেশে ব্যবসার ‘গেম চেঞ্জার’ এআই: ৫ জনে ১ জন সিইও-এর রাজস্ব বৃদ্ধির দাবি
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর চেয়ে চাহিদা তৈরিতে এগিয়ে বাংলাদেশ; তবে রোডম্যাপ ও ডেটা ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতির চিত্র পিডব্লিউসি’র জরিপে।
ঢাকা: দেশের কর্পোরেট সেক্টর ও ব্যবসায়িক মহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এখন আর কেবল ভবিষ্যতের কোনো বিলাসিতা বা প্রযুক্তিগত শব্দ নয়, বরং এটি দ্রুত গতিতে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং কৌশলগত প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক খ্যাতনামা নিরীক্ষা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডব্লিউসি)-এর ২৯তম সিইও সার্ভে (বাংলাদেশ সংস্করণ) শীর্ষক এক চাঞ্চল্যকর জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রতি পাঁচজন প্রধান নির্বাহীর (সিইও) মধ্যে একজন এখন সরাসরি স্বীকার করছেন যে এআই ব্যবহারের ফলে তাদের কোম্পানির রাজস্ব বা আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি, প্রতি চারজন সিইও-এর মধ্যে একজন (২৫ শতাংশ) জানিয়েছেন যে এআই技术的 সফল প্রয়োগের মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বা খরচ ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে ডিমান্ড জেনারেশন বা পণ্যের চাহিদা তৈরি এবং উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমকক্ষ দেশগুলোর চেয়েও অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
তবে প্রাথমিক এই অভাবনীয় সাফল্যের পরেও, পুরো প্রতিষ্ঠান জুড়ে এআই-এর পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর একীভূতকরণের যাত্রাটি এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া সিইওদের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ জানিয়েছেন যে তাদের প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট রোডম্যাপ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, পাঁচজন নির্বাহীর মধ্যে একজনেরও কম (২০ শতাংশের কম) মনে করেন যে তাদের ব্যবহৃত এআই টুল বা প্রযুক্তিগুলো প্রতিষ্ঠানের সমস্ত প্রয়োজনীয় ও সংবেদনশীল ডেটা বা তথ্যের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত রয়েছে। দেশে এআই-এর এই ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব, অপর্যাপ্ত পুঁজি বিনিয়োগ এবং দক্ষ কারিগরি জনবলের চরম সংকটকে। এই বিষয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগ্রুপ এ কে khan অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের গ্রুপ সিইও আসিফ ভূঁইয়া তার বিশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছেন যে, এআই এখন আর কোনো সাধারণ বা খণ্ডকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় নয়, বরং বিভিন্ন খাতে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য এটিই এখন মূল ভিত্তি। তবে পাইলট প্রকল্প বা প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে এটিকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হলে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে প্রথমে এর মৌলিক ভিত্তিগুলো ঠিক করতে হবে, যার মধ্যে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ, সঠিক ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং দেশের প্রেক্ষাপটের সাথে মানানসই প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
উল্লেখ্য, পিডব্লিউসি গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের ৪৫ জন শীর্ষস্থানীয় সিইও-এর ওপর এই নিবিড় জরিপটি পরিচালনা করে। এই এআই বিপ্লবের ফলে দেশের শ্রমবাজার ও চাকুরির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই-এর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র এবং মিড-লেভেল বা মধ্যবর্তী স্তরের কিছু চাকুরির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও, সিনিয়র বা উচ্চপর্যায়ের পদগুলো বাতিলে পরিবর্তে প্রযুক্তির সহায়তায় আরও বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর হবে। এই কারণে দেশের জনবলকে কর্মহীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে সুনির্দিষ্ট রি-স্কিলিং বা নতুন দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা এবং কর্মক্ষেত্রের এই রূপান্তরকে পরিকল্পিত উপায়ে পরিচালনা করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এআই বিপ্লবের পাশাপাশি, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা বহুমুখীকরণের (ডাইভারসিফিকেশন) এক নজিরবিহীন ক্ষুধা ও প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (৭৫ শতাংশ) সিইও জানিয়েছেন যে, তাদের কোম্পানিগুলো বিগত পাঁচ বছরে সম্পূর্ণ নতুন ও ভিন্ন কোনো ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ করেছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। মূলত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমানো এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সুযোগ লুফে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা।
তবে ব্যবসা বহুমুখীকরণের এই আগ্রাসী উদ্যোগের বিপরীতে আর্থিক রিটার্ন বা মুনাফা অর্জনের হার এখনও বেশ সীমিত। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৫ শতাংশ সিইও রিপোর্ট করেছেন যে তাদের মোট রাজস্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি অংশ এই নতুন খাতগুলো থেকে আসছে, যা নির্দেশ করে যে অধিকাংশ কোম্পানি এখনও প্রাথমিক বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপে রয়েছে। এই ক্রস-সেক্টর বা নতুন খাতের বিনিয়োগগুলোকে কীভাবে স্থায়ী ও টেকসই আয়ের উৎসে রূপান্তর করা যায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পিডব্লিউসি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কার্যকরভাবে ব্যবসার পুনর্গঠন করতে হলে নতুন খাতে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে এবং সেই সক্ষমতাগুলো নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করা হবে, নাকি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্জন করা হবে, সেই বিষয়ে সুশৃঙ্খল ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এই সমস্ত অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় বাজারে চলমান মুদ্রাস্ফীতির তীব্র চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশি সিইওদের মধ্যে এক অদম্য আশাবাদ ও ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। অধিকাংশ কোম্পানি জানিয়েছে যে তারা বিগত সময়ে বাজারে নিজেদের হিস্যা বা মার্কেট শেয়ার বাড়াতে সক্ষম হয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্থিতিস্থাপকতার ওপর তাদের গভীর ও অবিচল আস্থা রয়েছে।
তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ