এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ‘সর্বজনীন’ ভ্যাকসিন: মহামারি প্রতিরোধে নতুন ইতিহাস

admin

June 6, 2026

এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ‘সর্বজনীন’ ভ্যাকসিন: মহামারি প্রতিরোধে নতুন ইতিহাস

মানুষের শরীরে প্রথম ট্রায়ালেই অভাবনীয় সাফল্য; রুখে দেবে কোভিডের সব ভ্যারিয়েন্টসহ ইবোলার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস।

ঢাকা: চিকিৎসা বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ব্রিটিশ গবেষকরা। বিশ্বজুড়ে ভবিষ্যৎ মহামারির হুমকি মোকাবিলা এবং একাধিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ডিজাইন করা একটি নতুন ‘সর্বজনীন’ ভ্যাকসিনের সফল হিউম্যান ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ভ্যাকসিনের মূল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উদ্দীপক উপাদান বা অ্যান্টিজেন মানুষের শরীরে পরীক্ষার আগে সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শীর্ষ গবেষকের তৈরি এই পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনটি করোনার সমস্ত চেনা ভ্যারিয়েন্টসহ পশু-পাখি থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম এমন বহু রকমের বিপজ্জনক করোনাভাইরাসকে একযোগে ধ্বংস করতে সক্ষম। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রূপ পরিবর্তনকারী ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই ভ্যাকসিনটি যেভাবে কাজ করছে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের জন্য এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাজারে থাকা যেকোনো ভ্যাকসিন মূলত নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসের বর্তমান স্ট্রেইন বা রূপকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাসের মতো প্যাথোজেনগুলো অত্যন্ত দ্রুত নিজেদের জিনেটিক মিউটেশন বা রূপ পরিবর্তন করে ফেলে, যার ফলে বাজারে থাকা প্রচলিত ভ্যাকসিনগুলোর কার্যকারিতা দ্রুত কমে যায় এবং প্রতি বছর সাধারণ মানুষকে নতুন বুস্টার বা আপডেট ভ্যাকসিন নিতে হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই সনাতন ও ধীরগতির ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে সম্পূর্ণ উল্টো এবং প্রোগ্রেসিভ একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। তারা বিশ্বব্যাপী নজরদারির মাধ্যমে সংগৃহীত বিভিন্ন করোনাভাইরাসের বিশাল জিনেটিক ডেটাবেজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমে ইনপুট হিসেবে দেন। এআই এই বিপুল পরিমাণ জটিল জিনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন একটি কৃত্রিম ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ ডিজাইন করেছে, যা মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কোনো নির্দিষ্ট স্ট্রেইন নয়, বরং পুরো একটি ভাইরাস পরিবারের মূল ও অপরিবর্তনশীল কাঠামোকে চিনতে এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এই ঐতিহাসিক ও আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি-কে জানান যে, প্রচলিত ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সবসময় ভাইরাসের মিউটেশনের চেয়ে এক ধাপ পিছিয়ে থাকেন, কিন্তু এই এআই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ভাইরাসের পরিবর্তনের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকা। প্রথম দফার এই প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূলত ৩৯ জন সুস্থ মানব ভলান্টিয়ার অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে ভ্যাকসিনের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও মানবদেহে এর সহনশীলতার বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। এই ট্রায়ালের প্রাথমিক ইতিবাচক ফলাফল বিখ্যাত ‘জার্নাল অব ইনফেকশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এই প্রথম ধাপে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া কিছুটা মাঝারি মানের ছিল, তবে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ডিজাইন করা একটি অ্যান্টিজেন মানুষের শরীরে শতভাগ নিরাপদ প্রমাণিত হওয়াটাই বিজ্ঞানের জন্য এক বিশাল জয়। বর্তমানে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আরও নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করতে প্রায় ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর দ্বিতীয় ও আরও বড় পরিসরের ট্রায়াল পুরোদমে চলছে।

এই সফল গবেষণার সাথে যুক্ত সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফস্ট জানিয়েছেন যে, ভাইরাস যখন ক্রমাগত নিজের রূপ পরিবর্তন করতে থাকে, তখন সম্ভাব্য মহামারি প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন ডিজাইনে এই এআই প্রযুক্তি প্রথাগত পদ্ধতির চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও নির্ভুল। কেমব্রিজের এই অভিজ্ঞ গবেষক দলটি বর্তমানে একই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সর্বজনীন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভ্যাকসিন তৈরির কাজও শুরু করেছেন, যা সফল হলে মানুষকে আর প্রতি বছর নিয়ম করে ফ্লু শট নিতে হবে না। এর পাশাপাশি, মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা বার্ড ফ্লু (H5N1) এবং কঙ্গোয় তাণ্ডব চালানো প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের মতো মারাত্মক রক্তক্ষরণকারী জ্বরের বিরুদ্ধেও কাস্টমাইজড এআই ভ্যাকসিন তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের অধ্যাপক অ্যান্ডি পোলার্ড এই গবেষণার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গেম চেঞ্জার হতে যাচ্ছে, যা ভ্যাকসিনের উৎপাদন সময়কে কয়েক বছর থেকে মাত্র কয়েক দিনে নামিয়ে আনবে। যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞান মন্ত্রী লর্ড ভ্যালেন্সও এই আবিষ্কারকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বৈজ্ঞানিক দক্ষতার সাথে এআই-এর এই চমৎকার সংমিশ্রণ বিশ্বকে আগামী দিনের যেকোনো বৈশ্বিক মহামারি থেকে রক্ষা করতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ