সীমান্তে বিজিবির কড়া প্রতিরোধ: ২৪ ঘণ্টায় ভারতের ৮ পুশইন ব্যর্থ
আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা; যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত লাল-সবুজের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
ঢাকা: দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত চুক্তি লঙ্ঘন করে ভারতের পক্ষ থেকে পুশইনের বড় ধরনের অপচেষ্টা নজিরবিহীনভাবে প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানোর ৮টি পৃথক ও সুসংগঠিত চেষ্টা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজিবি। আজ শনিবার (৬ জুন) সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক জরুরি ও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম। বিজিবির এই তাত্ক্ষণিক ও দৃঢ় প্রতিরোধমূলক অবস্থানের কারণে কোনো সীমান্ত দিয়েই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি। এই ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং বিজিবি তাদের প্রতিটি সীমান্ত চৌকিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা হাই অ্যালার্ট জারি করেছে।
বিজিবির জনসংযোগ শাখা থেকে প্রাপ্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ও সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, গত এক দিনে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তগুলোতে বিএসএফ একযোগে এই পুশইন প্রক্রিয়া সচল করার চেষ্টা করে। এর মধ্যে ঝিনাইদহের মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ যাদবপুর সীমান্তে ৩ জন ব্যক্তি ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালালে সেখানে কর্তব্যরত বিজিবি টহলদল তাত্ক্ষণিকভাবে সীমান্তের শূন্য লাইনে (জিরো লাইন) অবস্থান নিয়ে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিজিবির এমন অনড় ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের মুখে অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। প্রায় একই সময়ে নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ করমুডাঙ্গা সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে একযোগে ১৭ জন ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করার একটি বড় ধরনের চেষ্টা করা হয়, যা বিজিবি টহলদলের তাত্ক্ষণিক ও সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে যায়। এছাড়া তিস্তা ব্যাটালিয়নের (৬১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ লালমনিরহাটের বড়খাতা ও পঁয়ষট্টিবাড়ী সীমান্ত এলাকা দিয়ে আরও ২১ জন ব্যক্তির একটি বিশাল দলকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালানো হলে বিজিবির কড়া বাধায় তাদের সেই অনুপ্রবেশের অপচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ দিঘলটারী সীমান্ত এলাকায় ৭ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কার্যকর প্রতিরোধ বলয় তৈরি করে এবং তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা প্রদান করে। একই ব্যাটালিয়নের দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় আরও ৪ জন ব্যক্তিকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার ফলে ওই ব্যক্তিরা বর্তমানে ভারতীয় ভূখণ্ডের কাঁটাতারবিহীন এক দুর্গম চর এলাকায় অবরুদ্ধ অবস্থায় অবস্থান করছে। এদিকে নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ পঞ্চগড়ের বড়বাড়ী প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকায় ভারত থেকে ১০ জন ব্যক্তিকে সীমান্তের কাঁটাতারের বাইরে এনে জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল রূপ নেয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে একটি জরুরি ও টানটান উত্তেজনাকর পতাকা বৈঠক (ফ্ল্যাগ মিটিং) অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে বিএসএফের পক্ষ থেকে পুশইনের শিকার ওই ব্যক্তিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করা হলেও, তাদের এই দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো বৈধ কাগজপত্র বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। যার ফলে বিজিবি সাফ জানিয়ে দেয়, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া একজন ব্যক্তিকেও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পা রাখতে দেওয়া হবে না।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই ধারাবাহিক পুশইন চেষ্টার পেছনে একটি গভীর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বিশেষ করে নেত্রকোণা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানাধীন বলিশী গিতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্বে থেকে পরিকল্পিতভাবে জড়ো করে রাখা ১৬-১৭ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফ সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তবে তারা তাদের অপচেষ্টা বন্ধ না করে ওই দলটিকে লেঙ্গুড়া সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফের চিকনী ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তর করেছে বলে বিজিবির গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, যা নির্দেশ করে যে বিএসএফ এখনও সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করানোর জন্য ওঁৎ পেতে আছে। এই বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতি, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী কোনো ধরনের পুশইন প্রচেষ্টা বাংলাদেশের কাছে কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক পরিস্থিতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সদা জাগ্রত রয়েছে।
অপরাধ ও সীমান্ত প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ