দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র বিক্ষোভ
প্রশ্ন ফাঁস ও সিবিএসই দুর্নীতির প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে অভিনব সমাবেশ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি।
ঢাকা: ভারতের জাতীয় স্তরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই’র অন-স্ক্রিন মার্কিং পদ্ধতিতে বড় ধরনের DNIs দুর্নীতির অভিযোগে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। এই দাবিতে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে এক নজিরবিহীন ও অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে ভারতের ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। গত শনিবার (৩০ মে) সকাল থেকেই দলটির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাধারণ মানুষের নজর কাড়তে তেলাপোকাকে প্রতীকী রূপ দিয়ে আয়োজিত এই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর তাৎক্ষণিক ইস্তফা দাবি করা হয় এবং প্রশ্ন ফাঁস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।
বিক্ষোভস্থলে জড়ো হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর প্রশাসনিক অদক্ষতার সমালোচনা করে বিভিন্ন ধরনের চতুর ও ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের একটি প্রধান প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দাও’। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিখ্যাত অর্থনৈতিক স্লোগানকে কটাক্ষ করে অন্য একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমরা মেক ইন ইন্ডিয়া চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি আমাদের দিয়েছেন লিক ইন ইন্ডিয়া’। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের আমলে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পাবলিক পরীক্ষার পবিত্রতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে কোটি কোটি সৎ ও মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এই ব্যতিক্রমী ও জোরালো আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব দেন সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বোস্টন ইউনিভার্সিটির মেধাবী শিক্ষার্থী অভিজিত দিপকে। ভারতের শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে চলমান এই আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিতে তিনি আমেরিকার বোস্টন থেকে বিমানে চড়ে সরাসরি দিল্লিতে আসেন। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় দিপকের হাতে ভারতের সংবিধানের মূল প্রণেতা ড. বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনীর একটি কপি দেখা যায়, যা আন্দোলনের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি প্রদর্শন করার একটি প্রতীকী প্রয়াস ছিল। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জানান, ভারতের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন নিয়ে যেভাবে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে, তা আর মুখ বুজে সহ্য করা যায় না এবং এই দুর্নীতির চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন রাজপথে অব্যাহত থাকবে।
ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হওয়ার বেশ আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের রণকৌশল ও কর্মসূচি ঘোষণা করে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল সিজেপি। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি বিশেষ পোস্টে তারা লিখেছিল, ভারতের সংবিধানের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে এবং এই সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে আমাদের তেলাপোকারা বিক্ষোভ শুরু করবে। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত কঠোর শর্তসাপেক্ষে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ সমাবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করে। পুলিশের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর সিজেপি তাদের এক্স হ্যান্ডেলে আরেকটি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট শেয়ার করে লেখে, দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে, সুতরাং তেলাপোকারা রাজপথে আসছে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায় ঘণ্টা বাজছে।
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশজুড়ে যে তীব্র ছাত্র ও যুব অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, এই অভিনব বিক্ষোভ তারই একটি বহিঃপ্রকাশ। উল্লেখ্য, দেশব্যাপী ব্যাপক জاليةতি ও প্রশ্ন ফাঁসের জেরে বাতিল হওয়া নিট-ইউজি (NEET-UG) ২০২৬ পরীক্ষাটি আগামী ২১ জুন পুনরায় দেশজুড়ে আয়োজনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে ভারতের জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা বা এনটিএ। তবে এই নতুন তারিখ ঘোষণার পরও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ কমেনি, কারণ তারা পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দিহান। অন্যদিকে, ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই’র দ্বাদশ শ্রেণীর ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে অন-স্ক্রিন মার্কিং পোর্টালের প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার টেন্ডার বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা মোদি সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এক চরম বিব্রতকর ও জবাবদিহিহীন পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ও জاليةতি ফাঁস হওয়ার পর থেকেই দিল্লির বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন এবং সাধারণ হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন দিল্লির রাজপথে নেমে আন্দোলন করছেন। এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার সময় দিল্লি পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ধস্তাধস্তি হয় এবং সেখান থেকে বেশ কয়েকজন শীর্ষ আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীকে আটক করে police বা পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ককরোচ জনতা পার্টির মতো একটি ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনের এই রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি মূলত ভারতের তরুণ প্রজন্মের ভেতরে জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ ও হতাশারই একটি ভিন্ন রূপ। এই অভিনব বিক্ষোভটি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে শিক্ষা খাতের সংস্কার ও দুর্নীতি দমনের বিষয়টিকে পুনরায় অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ