ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: নতুন অর্থবছরে ভর্তুকি চাহিদা ১.২০ লাখ কোটি টাকা

admin

June 4, 2026

ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: নতুন অর্থবছরে ভর্তুকি চাহিদা ১.২০ লাখ কোটি টাকা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকারের ওপর ভর্তুকির এক বিশাল বোঝা চেপে বসতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার ও খাদ্য আমদানির ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত বরাদ্দ দাবি করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য ইতিমধ্যেই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রস্তাব জমা পড়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ তিন-চতুর্থাংশই দাবি করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় ভর্তুকির চাহিদা এসেছে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে। পুরো অর্থবছরের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা প্রায় ৫৯,১৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাথমিক জ্বালানি আমদানির জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা পেট্রোবাংলা আগামী অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্যই ২৭ হাজার কোটি টাকা দাবি করেছে। বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকলে পুরো অর্থবছরে কেবল গ্যাস খাতেই ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় সার ও সেচ কার্যক্রমে ১৮ হাজার কোটি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য ১২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রস্তাব দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো অর্থ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, এলএনজির চড়া দাম এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বিকল্প তরল জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও ভারত ও নেপাল থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। সম্প্রতি সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতের আদানি পাওয়ার এবং নেপাল ও ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎকেও ভর্তুকির আওতায় আনা হয়েছে, যার জন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চাহিদাই চূড়ান্ত নয় এবং বাজার পরিস্থিতি ও মূল্য সমন্বয়ের ওপর ভর্তুকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ভর করবে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ১৬.৬৮ শতাংশ বা ১.৫২ টাকা বাড়িয়েছে, যা জুন মাসের বিল থেকে কার্যকর হবে। এই মূল্য বৃদ্ধির ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারের বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব সামাল দিতে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দামও সমন্বয় করেছে। সামগ্রিকভাবে আগামী বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে সরকার।

এদিকে এই বিপুল ভর্তুকির চাহিদাকে কেবল যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিতে নারাজ অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়লেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা হলো এর অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সম্পদের অপচয় এবং ভুল নীতি। দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতের সুশাসন নিশ্চিত না করায় এটি পুরোপুরি ভর্তুকিনির্ভর হয়ে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের কম রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতিতে এই বিপুল ভর্তুকি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা দেশের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে।

অর্থনীতি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ