হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের ৮ বছর পরও সংকটে ট্যানারি শিল্প, ধুঁকছেন ব্যবসায়ীরা
অর্থনীতি ও শিল্প প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬: দূষণমুক্ত ও পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্যে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের প্রায় আট বছর পার হলেও এখনো কাটেনি সংকট। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সার্টিফিকেশন না থাকায় দেশের ট্যানারি শিল্প এখনো তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (CETP) এখনো পুরোপুরি কার্যকর ও সম্পূর্ণ না হওয়ায় হাজারীবাগের সেই পুরনো পরিবেশ দূষণের চিত্রই এখন সাভারে ফিরে এসেছে।
সাভার ট্যানারি খাতের মূল সংকট ও বাস্তবতা:
* *সিইটিপি (CETP) বিপর্যয় ও নদী দূষণ:* সাভারের সিইটিপি সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তরল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে। ফলে ধলেশ্বরীসহ আশেপাশের অন্যান্য নদী ও জলাশয় ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
* *এলডব্লিউজি (LWG) সার্টিফিকেশনের অভাব:* ইউরোপ-আমেরিকার প্রিমিয়াম ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির জন্য ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (LWG) সার্টিফিকেশন থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশে ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে সচল প্রায় ১৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠানের এই বিশ্বমানের সার্টিফিকেট রয়েছে।
* *চীনের বাজারে কম মূল্যে বিক্রি:* এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশন না থাকায় বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো সরাসরি পশ্চিমা দেশে রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে চীনের কাছে অনেক কম দামে কাঁচা ও আধা-পরিশোধিত চামড়া বিক্রি করছে। চীন সেই চামড়া প্রসেস করে পরবর্তীতে চড়া দামে পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি করে বিপুল মুনাফা লুটে নিচ্ছে।
আলাদা মন্ত্রণালয় ও টেকসই নীতিমালার দাবি
গতকাল শনিবার (২৩ মে) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ERF) মিলনায়তনে আয়োজিত “সংকটে চামড়া শিল্প: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এই খাতের শীর্ষ নেতারা একগুচ্ছ দাবি ও সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন।
লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের (LIDFB) আহ্বায়ক সাদাত হোসেন সেলিম বলেন, “সাভারের সিইটিপি নিয়ে বছরের পর বছর শুধু আলোচনাই হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই খাতের কাঠামোগত সংকট দূর করতে এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, তৈরি পোশাক খাত আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল হলেও, চামড়া সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সম্পদ। চামড়াজাত পণ্য তৈরির মাধ্যমে এই খাতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন (Value Addition) সম্ভব।
আসন্ন ঈদুল আজহা ও কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের প্রস্তাব
তথ্যমতে, গত বছর দেশে ৯১ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল। দেশের বার্ষিক কাঁচা চামড়া সরবরাহের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই আসে ঈদুল আজহার সময়। ফলে এই চামড়া সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সংকট উত্তরণে এলআইডিএফবি (LIDFB) সরকারের কাছে ১৩ দফা সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. কাঁচা চামড়া সঠিক উপায়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য সারাদেশে সরকারি অর্থায়নে ১০ থেকে ১৫টি আধুনিক “rawhide preservation hubs” বা কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা।
২. চামড়া দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য সরকারি উদ্যোগে অথবা লিজ চুক্তির মাধ্যমে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপন করা।
৩. কোরবানি ঈদের সময় কাঁচা চামড়া ক্রয়ের জন্য ট্যানারি মালিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ স্বল্পমেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করা।
রপ্তানি সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক বাজার
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.১৪৫ বিলিয়ন ডলারে। এদিকে গ্লোবাল মার্কেট রিসার্চ ফার্ম ‘ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস’-এর মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার ৭৩৮.৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আব্দুল মুত্তালিব বলেন, “বাংলাদেশ যদি এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারের মাত্র ১ শতাংশও দখল করতে পারে, তবে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় সহজেই ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।” কিন্তু তার জন্য সাভারের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারিগুলোর আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
শিল্প ও বাণিজ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ