ইরানের সাথে ধীরগতির আলোচনায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, ‘চূড়ান্ত’ হামলার প্রস্তুতিতে হোয়াইট হাউস

admin

May 23, 2026

ইরানের সাথে ধীরগতির আলোচনায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, ‘চূড়ান্ত’ হামলার প্রস্তুতিতে হোয়াইট হাউস

ইরানের সাথে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধবিরতির আলোচনা প্রত্যাশিত গতিতে আগ না বাড়ায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির টেবিল ছেড়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখন নতুন করে একটি বড় ধরনের এবং ‘চূড়ান্ত’ সামরিক হামলার দিকে ঝুঁকছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শুক্রবার (২২ মে) সকালে হোয়াইট হাউসে তাঁর শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা দল নিয়ে এক অত্যন্ত জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios) দুই শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করেছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ওভাল অফিসের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্পের সাথে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, সিআইএ (CIA) ডিরেক্টর জন র‍্যাটক্লিফ এবং হোয়াইট হাউসের পাওয়ারফুল চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস। তবে কূটনৈতিক সফরে ইউরোপে থাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অন্য একটি সামরিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকায় জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি। বৈঠকে ট্রাম্পকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার খসড়া চুক্তির সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং কূটনীতি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য নিখুঁত সামরিক অ্যাকশনের পরিকল্পনা (অপারেশনাল ব্লুপ্রিন্ট) ব্রিফ করা হয়।

এক ধাক্কায় যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসের ভেতরের সূত্রগুলো অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপে ট্রাম্প কূটনীতিকে ‘আরেকটি শেষ সুযোগ’ দেওয়ার কথা বললেও, বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যেই তিনি সামরিক পদক্ষেপের দিকে মনস্থির করেন। মূলত মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে আসা ইরানের পাল্টা প্রস্তাব মার্কিন শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ট্রাম্প চরম বিরক্ত। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট এখন এমন একটি ‘চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক’ (Decisive Action) সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন, যার মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী এক ধাক্কায় ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। এর ফলে ট্রাম্প খুব দ্রুত মার্কিন বিজয় ঘোষণা করে এই যুদ্ধ অধ্যায়ের স্থায়ী সমাপ্তি টানতে পারবেন। তবে চূড়ান্ত বোমাবর্ষণের নির্দেশনায় ট্রাম্প এখনও স্বাক্ষর করেননি।

ছেলের বিয়ে বাদ দিয়ে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প
নিরাপত্তা বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হোয়াইট হাউস থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাপ্তাহিক ছুটির সূচিতে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান শেষ করে ট্রাম্পের তাঁর নিউ জার্সির বেডমিনস্টার গলফ ক্লাবে যাওয়ার কথা ছিল, যা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করে তিনি সরাসরি ওয়াশিংটন ডিসি-তে ফিরে যান।

এমনকি ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নিশ্চিত করেছেন যে, আজ শনিবার (২৩ মে) বাহামাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তাঁর বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র (ডন জুনিয়র) ও বেটিনা অ্যান্ডারসনের রাজকীয় বিয়েতেও তিনি অংশ নিচ্ছেন না। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, “আমি আমার ছেলের বিয়েতে খুব যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার সামনে এখন ‘ইরান সংকট’ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় জরুরি বিষয় রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের প্রতি ভালোবাসার তাগিদে কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে আমার ওয়াশিংটন ডিসি-র হোয়াইট হাউসে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।”

শেষ মুহূর্তের পাকিস্তান-কাতার মধ্যস্থতা
যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলার সমরসজ্জা সম্পন্ন করছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে এক মহাবিপর্যয় ও আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে তেহরানের মাটিতে শেষ মুহূর্তের মরিয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান ও কাতার। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়কমন্ত্রী মহসিন নাকভি বর্তমানে তেহরানে অবস্থান করছেন। আজ শনিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার ও নীতি নির্ধারকদের সাথে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের বৈঠক করার কথা রয়েছে। একই সাথে কাতারের একটি বিশেষ দলও তেহরানে মধ্যস্থতা চালাচ্ছে।

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পাকিস্তান মূলত দুপক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক ‘৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি কার্যকরের জন্য চূড়ান্ত চেষ্টা (Final Push) চালাচ্ছে, যাতে এই সময়ের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানি অবরোধের বিষয়টি স্থায়ীভাবে সমাধান করা যায়। তবে এই আলোচনাকে ‘যন্ত্রণাদায়ক’ (Agonizing) হিসেবে বর্ণনা করেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রতিদিন খসড়া চুক্তিগুলোর আদান-প্রদান হলেও মূল জায়গাগুলোতে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।

নিজেদের অবস্থানে অনড় ইরান
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘায়েই এবং আইআরজিসি-র ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’ স্পষ্ট জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে বার্তা আদান-প্রদান চললেও কোনো চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তেহরানের প্রধান ফোকাস হলো—আগে সব ফ্রন্টে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা এবং সমুদ্রপথে মার্কিন জলদস্যুতা (নৌ-অবরোধ) স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধ বন্ধের শতভাগ গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর বা পরমাণু কর্মসূচি নিষ্ক্রিয়করণের মতো মার্কিন শর্তে ইরান কোনোভাবেই রাজি হবে না।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান-কাতার কোনো অলৌকিক সমঝোতা আনতে না পারলে, ট্রাম্পের নির্দেশে যেকোনো মুহূর্তে পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো গর্জে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক ও ওয়াশিংটন ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ