রসু খাঁ থেকে অনলাইন ডার্ক গ্রুপ: ধর্ষণের বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও ভার্চুয়াল জগতের লোমহর্ষক অন্ধকারের সন্ধানে

admin

May 21, 2026

রসু খাঁ থেকে অনলাইন ডার্ক গ্রুপ: ধর্ষণের বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও ভার্চুয়াল জগতের লোমহর্ষক অন্ধকারের সন্ধানে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, আরডিএম নিউজ ২৪

বাংলাদেশে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন নতুন কোনো ঘটনা নয়। শাহবাগ থেকে রাজপথ, কিংবা ফেসবুকের নিউজফিড—প্রতিটি বড় ঘটনার পর দেশ উত্তাল হয়। ক্ষোভের মুখে সরকার আসে, সরকার যায়, আসে নতুন নতুন কড়া বয়ান। কখনো ১২ ঘণ্টা, কখনো ৪৮ ঘণ্টা, আবার কখনো এক সপ্তাহের ‘আলটিমেটাম’ বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় অপরাধীদের দমনে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বেঁধে দেওয়া সময়সীমার ‘সিলসিলা’ বা চক্রটি আজীবন একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়।
ধর্ষকদের গ্রেফতার বা বিচার যে একেবারেই হয় না, তা নয়। অনেক আলোচিত মামলায় আদালত দ্রুততম সময়ে ফাঁসি বা যাবজ্জীবনের রায়ও শোনান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই রায়গুলোর সুরাহা শেষ পর্যন্ত কতটুকু হয়? ২০০৯ সালে গ্রেফতার হওয়া চাঁদপুরের কুখ্যাত সিরিয়াল রেপিস্ট রসু খাঁ কিংবা সাভারের সোহেল রানা—এমন অসংখ্য অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় হলেও আজ ২০২৬ সালেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরের চূড়ান্ত ধাপ আলো দেখেনি। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় বছরের পর বছর জেলখানায় বহাল তবিয়তে দিন কাটাচ্ছে এই নরপশুরা।

তবে এই বিচারহীনতা বা দীর্ঘসূত্রতাই কি শেষ কথা? আরডিএম নিউজ ২৪-এর এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর এক মনস্তাত্ত্বিক সামাজিক ব্যাধি, যা সমাজকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। দেশের ধর্ষণ মহামারি রূপ নেওয়ার পেছনে কেবল আইনি দুর্বলতাই দায়ী নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক শ্রেণির মানুষের চরম বিকৃত মনস্তত্ত্ব, যা বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং টেলিগ্রামের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অন্ধকার গলি: ‘ডার্ক ফ্যান্টাসি’ ও টেলিগ্রাম গ্যাং

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অপরাধীরা তাদের বিকৃত রুচি আড়াল করতে বেছে নিয়েছে এনক্রিপ্টেড এবং ক্লোজড কমিউনিটি গ্রুপগুলো। ফেসবুক এবং টেলিগ্রামে “Dark Fantasy”, “Live Together” সহ এমন অসংখ্য নামসর্বস্ব গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার বিকৃত মানসিকতার মানুষ প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে।
এই গ্রুপগুলোর কার্যপদ্ধতি সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানাবে:

  • ছবির রেটিং ও ধর্ষণকামিতা: সাধারণ মেয়েদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে ছবি চুরি করে এই গ্রুপগুলোতে পোস্ট করা হয়। এরপর চলে সেই ছবির ‘রেট’ নির্ধারণ এবং মেয়েটিকে কীভাবে ধর্ষণ করা হবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
  • নারী সদস্যদের সম্পৃক্ততা: অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভয়াবহ তথ্য হলো, এই গ্রুপগুলোতে কেবল পুরুষই নয়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সদস্যও রয়েছে, যারা নিজেরাও এই ধরনের নোংরা এবং বিকৃত চিন্তাভাবনা লালন ও প্রচার করেন।
  • ইনসেস্ট (Incest) বা পারিবারিক যৌন বিকৃতি: টেলিগ্রামের একাধিক গোপন চ্যাট গ্রুপে আপন মা, বোন, মেয়ে, ভাই বা বাবার প্রতি যৌন লিপ্সা এবং বিকৃতি ছড়ানো হচ্ছে। শুধু চিন্তাভাবনা প্রকাশই নয়, নিজেদের পরিবারের সদস্যদের অবচেতন মনে বা জোরপূর্বক হ্যারাসমেন্টের ভিডিও চিত্র ধারণ করে তা এই গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি: যখন বিকৃতিই ‘অধিকার’

গোপনীয়তা এবং আইনি সুরক্ষার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করে, আরডিএম নিউজ ২৪-এর এই অনুসন্ধানী দল ছদ্মনামে এই চক্রের বেশ কয়েকজন সক্রিয় সদস্যের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। তাদের সাথে কথোপকথনে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তোলার জন্য যথেষ্ট।

ব্যক্তি ১ (তরুণ, বয়স ১৬):
“ভাইয়া, আমার এই চিন্তাভাবনার শুরু হয়েছে পর্নো দেখার পর থেকে। একবার আমার বন্ধু আমাকে মা-ছেলের একটা পর্নো ক্লিপ দেখিয়েছিল, তারপর থেকেই নিজের মায়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। প্রায়ই মা যখন গোসল করতে যান, আমি চুরি করে দেখি এবং রুমে এসে…”

ব্যক্তি ২ (তরুণ, বয়স ২৪):
“লুকিয়ে তো অনেকে অনেক কিছু করে। আমি একবার সুযোগ বুঝে আমার আপন বোনকে শরবতের সাথে ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে অচেতন করে এই কাজ (ধর্ষণ) করেছিলাম। ওইটার ভিডিও আমাদের গ্রুপে দেওয়ার পর সবাই অনেক বাহবা দিছে।”
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে যখন এই চক্রের একজন নারী সদস্য (মা) নিজের সন্তানের সাথে করা নৃশংসতার কথা অকপটে স্বীকার করেন:

ব্যক্তি ৩ (নারী, গৃহবধূ):
“আমার স্বামী বেশির ভাগ সময় ব্যবসার কাজে বাইরে থাকত। একাকীত্ব কাটাতে পর্নো দেখা শুরু করি। ‘Mom and Son’ (মা ও ছেলে) ক্যাটাগরির ভিডিওগুলো আমার ভালো লাগত। দেখতে দেখতে আমার নিজের ৯ বছরের ছেলের দিকে নজর যায়। একদিন নতুন একটা খেলার কথা বলে ওর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করি।”

প্রশ্ন: কতবার করেছেন এই কাজ?
“কয়েকবার করেছি। ছেলে তো ছোট, ও তো আর এসব বুঝত না। একবার স্বামীর সাথে ঝগড়া হওয়ার পর রাগ করে ছেলের সাথে ওই অবস্থার ভিডিও করে রাখি। ভাবছিলাম স্বামীকে পাঠাব। এখনও পাঠাইনি, তবে সামনে আমার সাথে ঝামেলা করলে ওইটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করব।”

এই বিকৃতকামীরা নিজেদের ‘ইনসেস্ট কমিউনিটি’ বলে দাবি করে এবং এই চরম অপরাধমূলক মানসিকতাকে তাদের আধুনিক ‘অধিকার’ বা ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রকট সংকট এবং ‘পেডোফিলিয়া’র স্বাভাবিকীকরণ
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরনের ইনসেস্ট এবং সাইবার-সেক্সুয়াল ক্রাইম আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের পরেই এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব আইডি বা গ্রুপ বন্ধ করলেও, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তারা নতুন ভিপিএন এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এরই সমান্তরালে দেশের আরেকটি নীরব ঘাতক হলো পেডোফিলিয়া (Pedophilia) বা শিশু যৌনাসক্তি। আমাদের সমাজে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে পেডোফিলিয়াকে অনেক সময় সংস্কৃতির আড়ালে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা রয়েছে। ৬০ বা ৭০ ঊর্ধ্ব বৃদ্ধরা যখন ১৪-১৫ বছরের কিশোরীদের প্রতি অনৈতিক আকর্ষণ দেখায় এবং সমাজ সেটাকে ‘কচি মেয়ে’ বা ‘অপ্রাপ্তবয়স্কের প্রতি দুর্বলতা’ বলে হালকা রসিকতায় উড়িয়ে দেয়, তখন তা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। এই সামাজিক উদাসীনতা আজ দেশের জন্য অন্যতম বড় হতাশার কারণ।

আরডিএম নিউজ ২৪-এর পর্যবেক্ষণ: সমাধান কোথায়?

ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে হলে কেবল রাজপথের আন্দোলন কিংবা আদালতের ডকে আসামিকে দাঁড় করানোই যথেষ্ট নয়। গোড়ায় গলদ রেখে আগায় পানি ঢাললে এই সিলসিলা চলতেই থাকবে।
১. কঠোর সাইবার নজরদারি: ফেসবুক, এক্স এবং বিশেষ করে টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বিটিআরসি (BTRC) এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এই ডার্ক গ্রুপগুলোর অ্যাডমিন এবং সক্রিয় সদস্যদের দ্রুত ট্র্যাকিং করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি বিকৃতির মূল উৎস অবাধ পর্নোগ্রাফি আসক্তি। ডার্ক পর্নোগ্রাফিক সাইটগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আইপি ব্লক নিশ্চিত করতে হবে।
৩. দ্রুততম সময়ে রায় কার্যকর: অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে হলে রসু খাঁ বা সোহেল রানার মতো বন্দিদের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করতে হবে। অপরাধ করে বছরের পর বছর জেলের ভেতর ‘আরামের জীবন’ কাটানোর সুযোগ বন্ধ হওয়া জরুরি।
৪. পারিবারিক ও মানসিক সচেতনতা: পেডোফিলিয়া এবং ইনসেস্টের মতো বিষয়গুলোকে ট্যাবু না ভেবে, শৈশব থেকেই সন্তানদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ শিক্ষা দেওয়া এবং ইন্টারনেটে তাদেরActivity-র ওপর নজর রাখা এখন সময়ের দাবি।
যদি এখনই এই মানসিক ব্যাধি এবং অনলাইন গ্যাংগুলোর বিস্তার রুখে দেওয়া না যায়, তবে আগামী দিনে ঘরের ভেতরেই তৈরি হবে একেকটি অদৃশ্য ধর্ষক, যা কোনো আদালত বা আইনের পক্ষেও ঠেকানো সম্ভব হবে না।

অনুসন্ধানী ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

নিচে তার কিছু প্রমাণ দেওয়া হলো:

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ