দেড় কোটি টাকার বেশি আয়ে ৩৫% আয়করের প্রস্তাব: লক্ষ্য বৈষম্য কমানো নাকি সৎ করদাতাদের ওপর চাপ?

admin

May 21, 2026

দেড় কোটি টাকার বেশি আয়ে ৩৫% আয়করের প্রস্তাব: লক্ষ্য বৈষম্য কমানো নাকি সৎ করদাতাদের ওপর চাপ?

দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পদ বৈষম্য কমিয়ে আনতে আগামী জাতীয় বাজেটে অতি ধনীদের ওপর আয়করের সর্বোচ্চ হার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, যাদের বার্ষিক আয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি (মাসে সাড়ে ১২ লাখ টাকার ওপরে), তাদের জন্য সর্বোচ্চ আয়কর হার নির্ধারণ করা হতে পারে ৩৫ শতাংশ। আগামী জুনে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে, সংশোধিত এই কর হার ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী তিন বছরের জন্য বলবৎ থাকবে। বর্তমানে বার্ষিক ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আয়কর দিতে হয়।

এনবিআরের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো অতি ধনীদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপের মাধ্যমে ধনী-গরিবের মধ্যকার আয় বৈষম্য কমিয়ে আনা।”

এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে এই মুহূর্তে প্রায় ৩০ হাজার করদাতা এই নতুন কর-স্ল্যাবের আওতায় পড়বেন। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। গত মার্চ মাসে প্রাক-বাজেট আলোচনা চলাকালে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান প্রথমবারের মতো এ ধরনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
নতুন এই কর প্রস্তাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্যোগকে নীতিগতভাবে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “বেশি আয়ের মানুষদের অবশ্যই বেশি কর দেওয়া উচিত।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কর ফাঁকি রোধ করা না গেলে শুধু হার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, যারা নিয়মিত ও সততার সঙ্গে কর দেন, বারবার শুধু তাদের ওপরই চাপ বাড়ানো ঠিক নয়। কর প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে করদাতার পরিধি বাড়ানোর দিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে, ট্যাক্স বিশেষজ্ঞ এবং স্ম্যাক অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া এই প্রস্তাবকে একটি “আর্থিক ভুল পদক্ষেপ (ফিসক্যাল মিসস্টেপ)” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, এই নীতি সৎ করদাতাদের শাস্তির মুখে ফেলবে এবং বিশাল ‘ছায়া অর্থনীতিকে’ সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাবে।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে ১ কোটি ২৮ লাখ ই-টিন (e-TIN) ধারী রয়েছেন, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। ফলে করজাল বিপজ্জনকভাবে সংকুচিত হয়ে আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, উচ্চ প্রান্তিক কর হার এবং সম্পদ কর একসঙ্গে কার্যকর হলে করের বোঝা অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে দেশে মূলধন পাচারের ঝুঁকি তৈরি হবে এবং দেশীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

ক্ষুদ্র একটি সৎ করদাতা গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে, অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাঠামোর আওতায় আনতে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেমের ওপর বেশি জোর দেওয়ার আহ্বান জানান এই বিশেষজ্ঞ।

অর্থনীতি ও বাণিজ্য ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ