গর্ভাবস্থা থেকে বার্ধক্য: আগামী বাজেটে সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তার নতুন রূপরেখা
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে দিতে এবার ‘লাইফ-সাইকেল’ বা জীবনচক্রভিত্তিক সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা মডেল চালুর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে অবকাঠামোগত খাতের চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আমূল পরিবর্তন
বিদ্যমান খণ্ডিত ও অ্যাডহক ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো থেকে সরে এসে সব নাগরিককে একটি একক ছাতার নিচে আনাই এই নতুন মডেলের মূল লক্ষ্য। এই ব্যবস্থার অধীনে একজন নাগরিক গর্ভকালীন সময় থেকেই রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আসবেন। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে শিক্ষাজীবন, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বা বেকার ভাতা এবং শেষ বয়সে বার্ধক্যকালীন আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এই রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকেই ‘ওয়ান পার্সন, ওয়ান অ্যাকাউন্ট’ নীতির ভিত্তিতে একটি ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’ চালুর কাজ শুরু হবে, যা সুবিধাভোগী নির্বাচনে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
বাজেট বরাদ্দ ও ২০৩২ সালের লক্ষ্যমাত্রা
চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৬group হাজার কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এই কার্যক্রম শুরু হলেও, ২০৩২ সালের মধ্যে দেশের সকল নাগরিককে এই সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার একটি মহাপরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বিএনপির ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আগামী বাজেটে বড় ধরনের কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ। এছাড়া দেশব্যাপী বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর মাধ্যমে আরও ৩৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। সব মিলিয়ে নতুন করে ১ কোটি ২১ লাখ মানুষকে এই নিরাপত্তা বেষ্টনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার ফলে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৩ কোটি ৬৩ লাখে।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন ও চ্যালেঞ্জ
এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, ২০১৫ সালে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা থমকে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, এই লাইফ-সাইকেল মডেলটি সফল করতে হলে সরকারকে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের জনসংখ্যাভিত্তিক নিখুঁত প্রাক্কলন এবং দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক কৌশল তৈরি করতে হবে।
অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সামাজিক সুরক্ষার পরিধি ধীরে ধীরে সর্বজনীন করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিশাল কর্মসূচি সফল করার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতার ওপর।
ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে এবারের বাজেট বক্তৃতার খাসড়ায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে নতুন স্কেলের বর্ধিত মূল বেতনের অর্ধেক আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেওয়া হবে। বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এবং এর পরের অর্থবছর থেকে সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ ভাতা চালু হবে। আগামী রবিবার এই চূড়ান্ত খসড়াটি অর্থমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর বৈশ্বিক চাপ
সামাজিক খাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং পূর্ব এশিয়ার বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে আগামী বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানোর চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। বিশেষ করে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং নতুন যুদ্ধবিমান ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে সামরিক কেনাকাটা খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অর্থনীতি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ