হানিট্র্যাপে ফেলে উবার চালককে হত্যা: চাকরিচ্যুত সেনাসদস্যসহ গ্রেপ্তার ৪
তুরাগ নদী থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের রোমহর্ষক রহস্য উদ্ঘাটন করলো পিবিআই; গাড়ি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে পাতা হয়েছিল রূপের ফাঁদ।
ঢাকা: রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকার তুরাগ নদী থেকে উবার চালক মো. লোকমান সরদারের (৩৮) বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের রোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মূলত প্রাইভেট কার ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ‘হানিট্র্যাপ’ বা রূপের ফাঁদে ফেলে ওই চালককে সুকৌশলে ডেকে এনে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে একটি পেশাদার অপরাধী চক্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন এক চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য। আজ শনিবার (৬ জুন) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির অতিরিক্ত উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক মো. এনায়েত হোসেন মান্নান। এই চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী ও এক নারীসহ চক্রের ৪ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে ছিনতাই হওয়া প্রাইভেট কারটি।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন—চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য ও এই চক্রের মূল হোতা মো. এস এম সালমান (২৯), মো. আদিব ইসলাম (১৯), জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আর্নবা মীম (২১) এবং মো. সবুজ মিয়া (৩৫)। বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর শাখার একটি দক্ষ টিম অভিযান পরিচালনা করে সালমান ও আদিবকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার সদর থেকে, ফাঁদ পাতা নারী সদস্য মীমকে ঢাকার খিলক্ষেত এবং সবুজ মিয়াকে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের পর চক্রের লুকিয়ে রাখা প্রাইভেট কারটি গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারী সালমান ইতিমধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে হাজির হয়ে ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যা এই মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিবরণ দিয়ে পিবিআই-এর অতিরিক্ত উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, গত ১ জুন দক্ষিণখানের তুরাগ নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে পিবিআই আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) বিশ্লেষণ করে পরিচয় নিশ্চিত করে, যার নাম লোকমান সরদার এবং তিনি পেশায় একজন উবার চালক ছিলেন। গভীর তদন্তে জানা যায়, তাকে গাজীপুরের টঙ্গীর পাখির বাজার এলাকায় নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে বস্তায় ইট ভরে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কাজ করেছে একটি সুসংগঠিত ব্ল্যাকমেইলিং ও হানিট্র্যাপ চক্র। ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২৬ মে রাতে, যখন এই চক্রের সদস্যরা টঙ্গীর পাখির বাজার বস্তি এলাকায় একত্রিত হয়ে মাদক সেবন করে। পরদিন ভোরে তারা একটি উবার কার ডাকে এবং সালমান ও মীমসহ তিনজন লেকসিটির কনকর্ড টাওয়ার এলাকায় যান। সেখান থেকে মীম ২ হাজার ৫০০ টাকায় গাড়িটি ভাড়া করে সাভারে যাতায়াত করেন। মূলত ওই ভ্রমণের সময়ই চালক লোকমানের সরলতার সুযোগ নিয়ে তার মূল্যবান গাড়িটি ছিনতাই করার চূড়ান্ত নীল নকশা তৈরি করে চক্রটি।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৩০ মে মধ্যরাতে মীমকে দিয়ে উবার চালক লোকমানকে ফোন করানো হয় এবং মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ করে টঙ্গীর পাখির বাজার এলাকায় ডেকে আনা হয়। লোকমান সরল বিশ্বাসে সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ওত পেতে থাকা চক্রের পুরুষ সদস্যরা তাকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে মারধর শুরু করে। তারা লোকমানের ওপর বানোয়াট ও মিথ্যা অভিযোগ তোলে যে, সাভার যাওয়ার দিন তিনি মীম-এর কাছ থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিয়েছেন। এই মিথ্যা অপবাদের ভয় দেখিয়ে ও মামলা-হামলার হুমকি দিয়ে তারা লোকমানকে জিম্মি করে এবং একপর্যায়ে প্রাণে বাঁচার আকুতি জানিয়ে লোকমান তার পরিচিত বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ হাজার টাকা এনে পাচারকারীদের দেন। তার সাথে থাকা নগদ টাকাও চক্রটি লুটে নেয়। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হয়নি অপরাধীরা; তারা আরও নৃশংসভাবে মারধর শুরু করলে একপর্যায়ে লোকমান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরপর প্রমাণ লোপাটের জন্য গভীর রাতে তার মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
চক্রের হোতা সালমান সম্পর্কে পিবিআই-এর বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত এস এম সালমান একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক অপকর্মের দায়ে তাকে সেনাবাহিনী থেকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর সে স্থায়ীভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজের একটি অপরাধী দল গড়ে তোলে। সামাজিক আড়াল তৈরি করতে মীম ও সালমান নিজেদের ভুয়া স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিতেন, যাতে সমাজ বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সন্দেহ না করে। সালমানের নেতৃত্বে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বুকে হানিট্র্যাপ বা নারী দিয়ে ফাঁদ পেতে বিত্তবান ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও বিভিন্ন থানায় একাধিক ব্ল্যাকমেইলিং ও ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর কঠোর আইনি প্রক্রিয়া শেষে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছে পিবিআই।
অপরাধ ও আইন শৃঙ্খলা প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ