সৌদি আরবে নারকীয় নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারী, পাশে নেই রাষ্ট্র

admin

June 4, 2026

সৌদি আরবে নারকীয় নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারী, পাশে নেই রাষ্ট্র

ঢাকা: এক বুক আশা আর ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সন্তান ফারহানা (ছদ্মনাম)। ভেবেছিলেন, একটি সৌদি কোম্পানিতে ভালো চাকরি করে নিজের জীবনের চরম দারিদ্র্য এবং অকাল বৈধব্যের কালো মেঘ কাটিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সেই মরুভূমির দেশটিতে পা রাখার পর তার জীবন এক অবর্ণনীয় ও নারকীয় দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সেখানে সরকারি অনুমোদনহীন দালাল ও আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের হাতে নির্মমভাবে বিক্রি হয়ে যান তিনি। এরপর তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক দাসবৃত্তি, ভয়াবহ যৌন শোষণ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় বন্দিত্ব। দীর্ঘ পাঁচ মাস সৌদি কারাগারে অবর্ণনীয় নির্যাতনের পর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি সম্পূর্ণ পঙ্গু, ক্ষুধার্ত এবং পাশবিকতার শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরে আসেন এই নারী।

গত ২৪ মে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের (BRAC) प्रत्यक्ष তত্ত্বাবধানে ও চিকিৎসায় একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন ফারহানা। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ব্র্যাক এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নিবিড় চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসন শেষে আজ ৪ জুন তিনি তার বৃদ্ধা মা ও সদ্যজাত নবজাতক কন্যাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কিন্তু পেছনে রেখে গেছেন এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার প্রতি চরম ক্ষোভ। ঢাকা ছাড়ার প্রাক্কালে অশ্রুসিক্ত চোখে ফারহানা বলেন, “আমাদের বাংলাদেশে জীবন যতই কঠিন হোক না কেন, এখানে আমরা যে সামান্য টাকা আয় করি, সেটাই বিদেশের ওই নরকের চেয়ে হাজার গুণ ভালো। বিদেশ যাওয়ার আগে ভেবেছিলাম আমার পুরো জীবনটাই বদলে যাবে, সন্তানদের একটা ভালো ভবিষ্যৎ দিতে পারব। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর বুঝতে পারলাম, কীভাবে সেখানে টাকার বিনিময়ে পশুর মতো মানুষ কেনাবেচা করা হয়।”

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া ফারহানার জীবন শুরু থেকেই ছিল কণ্টকাকীর্ণ। খুব ছোটবেলায় তিনি তার বাবাকে হারান। পরবর্তীতে মা অন্যত্র বিয়ে করলে ফারহানার ঠাঁই হয় বৃদ্ধ নানা-নানির সংসারে। দারিদ্র্যের কারণে একপর্যায়ে ঘর থেকে পালিয়ে তিনি একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে এক নারীর সহায়তায় ঢাকায় আসেন। কৈশোরেই তার বিয়ে হয়ে গেলেও সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; অল্প বয়সেই তার স্বামী মারা যান। একবারে নিঃস্ব ও একা হয়ে পড়া ফারহানার কোলে তখন এক শিশু সন্তান এবং গর্ভে আরও একটি সন্তান। অভাবের তীব্র তাড়নায় নিজের সদ্যজাত দ্বিতীয় কন্যাসন্তানটিকে অন্য একটি পরিবারের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন তিনি। এরপর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় (গার্মেন্টস) সামান্য বেতনে চাকরি নেন। সেখানেখণ্ডকালীন কর্মরত অবস্থায় এক স্থানীয় শ্রম দালালের সাথে তার পরিচয় হয়, যে তাকে সৌদি আরবের একটি স্বনামধন্য সংস্থায় উচ্চ বেতনে প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখায়। ওই দালালের কথায় বিশ্বাস করে ফারহানা নিজের জমানো সব টাকা দিয়ে পাসপোর্ট, বাধ্যতামূলূক মেডিকেল পরীক্ষা ও ভিসার খরচ তোলেন এবং দালালকে ১০ হাজার টাকা কমিশন দিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমান।

তবে জেদ্দায় পা রাখার পর মুহূর্তের মধ্যেই সেই স্বপ্নের কর্পোরেট চাকরির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল কুৎসিত চেহারাটি বেরিয়ে আসে। বিমানবন্দর থেকে ফারহানাকে সরাসরি একটি গোপন হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আগে থেকেই আরও দুজন বাংলাদেশি নারীকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাদের দিনের পর দিন নামমাত্র খাবার দিয়ে আটকে রাখা হয়। এরপর এক সৌদি নাগরিক এসে ফারহানাকে জোরপূর্বক সেখান থেকে নিয়ে যায়। তাকে বলা হয়েছিল, কোম্পানিতে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়ার আগে তাকে সাম্যইকভাবে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতে হবে। কিন্তু সেই পাঁচ তলা আলিশান বাড়িতে ঢোকার পরপরই তার পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন এবং সমস্ত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে চব্বিশ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ না দিয়ে কঠোর শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়। তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে একদিন ফ্রিজ থেকে কয়েকটি খেজুর খাওয়ার অপরাধে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তার ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন এবং তার জন্য রান্নাঘরে ঢোকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর একদিন ওই পরিবারের এক সদস্য একটি ডিজিটাল অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে ফারহানাকে বার্তা দেখায়, যা দেখে তার পায়ের তলার মাটি সরে যায়। সেখানে লেখা ছিল—তাকে ১০ হাজার সৌদি রিয়ালের (প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা) বিনিময়ে পাচারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি ‘কিনে’ নেওয়া হয়েছে এবং তার প্রথম তিন মাসের অগ্রিম বেতনও দালালকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফারহানা জানান, সেখানে কাজের পাশাপাশি ওই গৃহকর্তার ছেলে তাকে প্রতিনিয়ত যৌন হেনস্থা করতে শুরু করে। এই বিষয়ে তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে বিচার চাইলে উল্টো তাকেই দোষারোপ করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে এক রাতে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে মদিনার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে স্থানীয় পুলিশের কাছে আশ্রয় ও সাহায্য চান ফারহানা, কিন্তু সৌদি পুলিশ তাকে কোনো প্রকার আইনি সহায়তা বা সুরক্ষা না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে পুতুল নামের এক বাংলাদেশি নারী তাকে জেদ্দায় ভালো কাজের आश्वासन দিলে খলিল নামের এক বাংলাদেশি গাড়ি চালক তাকে সেখানে নিয়ে যায়। কিন্তু জেদ্দায় পৌঁছানোর পর ফারহানা বুঝতে পারেন তিনি আরেকটি বড় পতিতাবৃত্তি ও পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। পুতুল ও খলিল তার কাছে ৩ হাজার রিয়াল দাবি করে এবং জানায় যে টাকা পরিশোধ না করলে তাকে ছাড়া হবে না। ফারহানা তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে রড দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং একটি অন্ধকার ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তিনি বাধ্য হন এবং চক্রটি তাকে বিভিন্ন হোটেলে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক বাণিজ্যিক যৌন ব্যবসায় লিপ্ত করে তার উপার্জিত সমস্ত টাকা নিজেরা হাতিয়ে নেয়।

সেখানからも কোনোমতে পালিয়ে ফারহানা পবিত্র মক্কা নগরীতে আশ্রয় নেন এবং হাজিদের কাছে তসবিহ, জায়নামাজ ও বোতলজাত পানি বিক্রি করে কোনো রকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। সেখানে এক পাকিস্তানি নাগরিকের সাথে তার পরিচয় হয়, যে প্রথম দিকে তাকে সাহায্য করার ভান করে পরবর্তীতে এক পাকিস্তানি নারীর কাছে হস্তান্তর করে। ওই নারী তাকে ভালো আশ্রয়ের কথা বলে মক্কার বাইরের এক নির্জন মরুভূমির ভেতরের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আবার বন্দি করে এবং সেখানে তাকে একাধিক ব্যক্তির পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। লাগাতার ধর্ষণের ফলে ফারহানা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং বিষয়টি ওই পাকিস্তানি নারীকে জানালে, সেই রাতেই সৌদি পুলিশ ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফারহানাকে আটক করে। সরকারি হেফাজতে বাধ্যতামূলক শারীরিক পরীক্ষার পর জানা যায় যে ফারহানা মরণপণ নির্যাতনের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাকে মানবপাচারের শিকার হিসেবে বিবেচনা না করে, সৌদি প্রশাসন তাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কারাগারে নিক্ষেপ করে। ফারহানার অভিযোগ, কারাবন্দি থাকাকালীন দীর্ঘ পাঁচ মাস তার ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, যার মধ্যে ছিল চাবুকপেটা, বৈদ্যুতিক শক এবং অজ্ঞাত রাসায়নিক ইনজেকশন পুশ করা, যার ফলে তিনি দিনের পর দিন অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতেন।

পাঁচ মাস পর সৌদি আরব সরকার তাকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর বিমানবন্দর সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBn) তার আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে তাৎক্ষণিকভাবে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সাথে যোগাযোগ করে এবং ব্র্যাক তাকে জরুরি খাবার ও যাতায়াত খরচ সরবরাহ করে। পরবর্তীতে ৮ মার্চ তাকে গাজীপুরে অবস্থিত বিএনডব্লিউএলএ-এর একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে (Shelter Home) পাঠানো হয়, যেখানে দীর্ঘ চিকিৎসায় তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই ঘটনার পর বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক অভিবাসন কাঠামো এবং সরকারি সংস্থাগুলোর চরম ব্যর্থতা ও উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে প্রায় ৩,০০০ নারী কর্মী চরম শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশে ফিরছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এরা প্রত্যেকেই সরকারের অফিশিয়াল চ্যানেল এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশে গিয়েছিলেন। ফারহানা দেশে ফেরার পর চার মাস পার হয়ে গেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি দফতর বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় তার খোঁজ নেয়নি, কোনো আইনি সহায়তার উদ্যোগ নেয়নি।” শরিফুল হাসান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “এই নির্যাতিত নারীদের ও তাদের সন্তানদের দায়িত্ব রাষ্ট্র কেন নেবে না? কেন দোষী দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো হচ্ছে না? রাষ্ট্রকে এর স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।” আজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে ফারহানা অশ্রুভেজা চোখে জানান, তিনি চান না অন্য কোনো বাংলাদেশি নারীর জীবন এভাবে ধ্বংস হয়ে যাক। নিজের নবজাতক কন্যার সুরক্ষার জন্য তিনি সমাজে একটি ভালো ও সহনশীল পরিবার খুঁজছেন, যারা তার মেয়েকে দত্তক নিয়ে একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে পারবে।

বিশেষ প্রতিবেদন | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ