মৃত শিশু গৃহকর্মী নিয়ে মিরপুর থেকে উত্তরার হাসপাতালে আসা দম্পতি আটক, শরীরজুড়ে নির্যাতনের চিহ্ন
রাজধানীর মিরপুরে মোছা. মাইমুনা (১০) নামে এক শিশু গৃহকর্মীকে দীর্ঘদিন যাবৎ নির্মম নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী দম্পতিকে আটক করেছে পুলিশ।
গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেল ৪টার দিকে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের গাউসুল আজম এভিনিউ এলাকায় অবস্থিত ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত মাইমুনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কালিসীমা গ্রামের ফুল মিয়ার মেয়ে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়।
এই ঘটনায় আটক হওয়া দম্পতি হলেন—আইটি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবরার ফাইয়াজ (৩৪) ও তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট মেহনাজ অনন্যা (৩৪)। আজ বুধবার (২০ মে) সকালে হাসপাতাল এলাকা থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণে তাদের মিরপুর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় আড়াই বছর ধরে মিরপুর-২ নম্বরের একটি ফ্ল্যাটে ওই দম্পতির বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত শিশু মাইমুনা। অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ে তাকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন করা হতো এবং প্রায়ই অনাহারে রাখা হতো। নিহত শিশুটির শরীরজুড়ে আঘাতের একাধিক গুরুতর চিহ্ন পাওয়া গেছে।
নিহতের মা বিউটি আক্তার ওরফে সালমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করে বলেন, “আড়াই বছর আগে এক নারীর মাধ্যমে মেয়েকে এই বাসায় কাজে দিয়েছিলাম। এরপর বহুবার অনুরোধ করেও মেয়ের সঙ্গে আমাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি গৃহকর্তারা কোনোদিন তাদের বাসার সঠিক ঠিকানাও আমাদের জানাননি।” তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়ে আগে এত শুকনা ছিল না। তার শরীরে কোনো আঘাতের দাগও ছিল না। ওরা আমার মেয়েটাকে নির্যাতন করে শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলল। আমি এর বিচার চাই।”
এদিকে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে গৃহকর্তা ফাইয়াজের বন্ধু চিকিৎসক ডা. মুনতাসির মাহমুদ ইভানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার পরামর্শেই পুরো বিষয়টি গোপন রাখতে মিরপুর থেকে অত দূরে উত্তরার ওই হাসপাতালে শিশুটিকে নেওয়া হয়েছিল। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।
উত্তরা স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর ভুক্তভোগীর দরিদ্র পরিবারের সঙ্গে মাত্র আড়াই লাখ টাকায় পুরো বিষয়টি আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেছিল প্রভাবশালী একটি চক্র। তবে পরবর্তীতে টাকার ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। খবর পেয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত দম্পতিকে আটক করে।
ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালের সহকারী ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম জানান, ডা. ইভানের মাধ্যমে শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল, যিনি বর্তমানে অন্য একটি হাসপাতালে কর্মরত। তবে শিশুটিকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু সাঈদ জানান, শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে নতুন ও পুরোনো অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে দীর্ঘদিন ধরে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এই বর্বরোচিত ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
অপরাধ ও আদালত ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ