মূলধন ২ হাজার কোটির কম হলে নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না ব্যাংক
শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬: দেশের ব্যাংকিং খাতের সার্বিক মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ লভ্যাংশ (Cash Dividend) ঘোষণা ও বিতরণের বিষয়ে বড় ধরণের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শনিবার (২৩ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital) ২ হাজার কোটি টাকার কম, তারা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না।
এই নতুন নিয়মাবলী ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণা থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও তা একইভাবে প্রযোজ্য থাকবে।
সর্বোচ্চ সীমা ৫০ শতাংশ ও বিদ্যমান সার্কুলার বহাল
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংক সব ধরনের সংবিধিবদ্ধ বা আইনি শর্ত পূরণ করে মুনাফা বিতরণের যোগ্যতা অর্জন করবে, তারা তাদের মোট ঘোষিত লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ নগদে পরিশোধ করতে পারবে। বাকি অংশ স্টক লভ্যাংশ বা বোনাস শেয়ার হিসেবে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে লভ্যাংশ বিতরণে কঠোর সর্বোচ্চ সীমা আরোপ করা হলেও, ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ জারি করা ডিওএস সার্কুলারসহ পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্ট সার্কুলারগুলোর অন্যান্য সমস্ত বিদ্যমান নির্দেশনা পুরোপুরি বহাল ও কার্যকর থাকবে।
কঠোর নিয়মে কোপ বসছে শীর্ষ ব্যাংকগুলোতে, লভ্যাংশ দিতে পারবে কেবল ব্র্যাক ব্যাংক
হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নতুন এই পরিশোধিত মূলধনের শর্তের কারণে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ভালো ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ সব সূচকে প্রথম দিকে থাকা কোনো ব্যাংকই আগামীতে নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এই কঠোর শর্তের বেড়াজাল পেরিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল ‘ব্র্যাক ব্যাংক’ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে। অন্যদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রয়োজনীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকলেও ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ (NPL) মাত্রাতিরিক্ত বেশি থাকায় তারাও লভ্যাংশ দেওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের পর ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপকেরা এই পদক্ষেপের আর্থিক যৌক্তিকতা স্বীকার করলেও সুপরিচালিত ভালো ব্যাংকগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন আরডিএম নিউজ ২৪-কে বলেন, “আর্থিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ এর আগে কিছু ব্যাংক দুর্বল মূলধন অবস্থা সত্ত্বেও উচ্চ হারে নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করেছে। তবে এই নীতিতে শক্তিশালী ও দুর্বল সব ব্যাংককে একইভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি রেশিওকে (সিএআর) কেন প্রধান মানদণ্ড করা হলো না? ন্যূনতম ১২.৫ শতাংশের পরিবর্তে যেসব ব্যাংকের সিএআর পরিস্থিতি ১৭-১৮ শতাংশের মতো শক্তিশালী, তাদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল।
একই সুরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার এই উদ্যোগ ইতিবাচক। বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখনও মূলধনের ঘাটতি রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত মূলধন থাকা ভালো ব্যাংকগুলোকে নগদ লভ্যাংশ দিতে বাধা দেওয়া হলে তা পুঁজিবাজারকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে। ফলে যেসব বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন জোগাচ্ছেন, তাদের উৎসাহও কমে যাবে।”
অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ