মুদ্রানীতিতে ‘দ্বিমুখী’ অবস্থান: বাংলাদেশ ব্যাংক কি পরস্পরবিরোধী সংকেত দিচ্ছে?
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, বাংলাদেশ: একই সাথে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সচল রাখা—এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কেবল অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিচ্ছে না, বরং তাকে এখন কঠিন সব ‘ট্রেড-অফ’ বা পারস্পরিক সাংঘর্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে কি কোনো মিশ্র বা পরস্পরবিরোধী সংকেত পাঠাচ্ছে?
অর্থনৈতিক সংকটের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে যে উদ্বেগগুলো উঠে এসেছে:
* *ডলার কেনা বনাম মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ:* কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বাজার থেকে ডলার কিনছে। কিন্তু ডলার কেনার বিনিময়ে বাজারে প্রচুর টাকা সরবরাহ করা হচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
* *ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ:* অস্থির বাজারে ব্যবসায়ীদের টিকে থাকতে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।
* *ঋণ প্রবৃদ্ধির খরা:* বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড তলানিতে নেমে (৪.৭%) এসেছে, কারণ ব্যাংকগুলো ব্যবসার চেয়ে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ ও লাভজনক মনে করছে।
কেন ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান ডলার ক্রয়ের কৌশলটি মূলত বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং রিজার্ভের ভাণ্ডার বাড়ানোর জন্য নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে বড় ঝুঁকি রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই ডলার ক্রয়ের ফলে বাজারে যে বাড়তি টাকার প্রবাহ তৈরি হচ্ছে তা ‘স্টেরিলাইজ’ (শোষণ) করা না হয়, তবে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রাস্ফীতি বিরোধী অবস্থানের বিপরীত হবে।
অন্যদিকে, সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমি) আলী মনে করেন, ঈদের আগে রেমিট্যান্সের বড় প্রবাহের কারণে ডলারের দাম দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। তাই বাজার সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই হস্তক্ষেপ করেছে। তবে সব বিশেষজ্ঞই একমত যে, এর সাথে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় করাটা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ: সুবিচার নাকি শৃঙ্খলার অভাব?
ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদের হার এবং অস্থিরতার কারণে ঋণ পরিশোধে ছাড় চেয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়াকে ‘খারাপ সংস্কৃতি’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, “এই অভ্যাস অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা মানে সমস্যার সমাধান না করে তা কেবল পিছিয়ে দেওয়া।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর পুনঃতফসিলের চেয়ে মূলধনী পুনর্গঠন (restructuring) বা একত্রীকরণ (merger) বেশি প্রয়োজন। এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের চেয়ে স্বল্পমেয়াদী ত্রাণ দিতে গিয়ে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে বলে তারা মনে করেন।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির খরা
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো এখন আর উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। বরং ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে উচ্চ মুনাফা ও ঝুঁকিহীন আয় নিশ্চিত করতে তারা বেশি পছন্দ করছে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) সহ উৎপাদনমুখী খাতগুলো ঋণের জন্য হিমশিম খাচ্ছে।
রুমি আলীর মতে, এটি একটি জটিল নীতিগত দোলাচল। উচ্চ সুদের হার মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করলেও তা বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন উৎপাদনমুখী খাতে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম বা টার্গেটেড রিফাইনান্সিং চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের চূড়ান্ত বার্তা: নীতিনির্ধারণী সমন্বয়
অর্থনীতিবিদদের ঐকমত্য হলো—বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের বড় অভাব রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার ধরে রাখা এবং প্রবৃদ্ধি সচল রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য একে অপরের পরিপূরক হতে হবে।
ড. ফাহমিদা খাতুনসহ অন্যান্য অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে যেন পুরো অর্থনীতির ক্ষতি না হয়। তাদের মতে, নীতিনির্ধারণী সংকেতগুলো বাজারের জন্য স্পষ্ট হওয়া জরুরি। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কেবল নীতির পরিবর্তন দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
অর্থ ও করপোরেট ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ