মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যা: পাশবিক দম্পতির ভাগ্য নির্ধারণের ঐতিহাসিক রায় আজ

admin

June 7, 2026

মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যা: পাশবিক দম্পতির ভাগ্য নির্ধারণের ঐতিহাসিক রায় আজ

অপরাধ ও আদালত প্রতিবেদক: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় মাত্র আট বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু রামিসা আক্তারকে জোরপূর্বক পাশবিক ধর্ষণের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে গলা কেটে ও দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায় আজ রোববার (৭ জুন) ঘোষণা করা হচ্ছে। ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন আজ দুপুরের পর দেশবাসীর গভীর নজরদারির মধ্যে এই ঐতিহাসিক মামলার রায় এজলাসে প্রকাশ করবেন। গত ১৯ মে সকালে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার ওপাশে পৈশাচিক নির্যাতন ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল ছোট্ট রামিসা। এই রোমহর্ষক ঘটনার পরপরই নিহতের পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি সোহেল رানা ও তার স্ত্রী স্বপ্ন আক্তারের বিরুদ্ধে শিশুকে জোরপূর্বক ধর্ষণ, নির্মম নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যা এবং পরবর্তীতে আলামত ধ্বংস ও লাশ চিরতরে গুমের উদ্দেশ্যে মরদেহ টুকরো টুকরো করার সুনির্দিষ্ট ও লোমহর্ষক অভিযোগ আনা হয়।

এই খবরের ভয়াবহতা এবং দেশজুড়ে তীব্র জনক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালতের নজিরবিহীন তৎপরতায় মাত্র ১৬ দিনের রেকর্ড সময়ের মধ্যে এই মামলার সমস্ত বিচারিক কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মাঝেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ ও জেরা, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুনানি সম্পন্ন হয়, যা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি দ্রুততম আইনি মাইলফলক ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। গত ২ জুন দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। রামিসার বাবার অশ্রুসিক্ত জবানবন্দির মাধ্যমে এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার বিশেষ ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে এবং চাচা, ফুপু, ফুপা ও প্রতিবেশীরা আদালতে সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কলিমউল্লাহ তাদের জেরা করেন। শুনানির সময় সাক্ষীদের মুখে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বিবরণ শুনে পুরো এজলাসে এক স্তব্ধ ও শোকাবহ পরিবেশের তৈরি হয় এবং উপস্থিত আইনজীবীসহ আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকেই ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

আদালতে রামিসার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পুলিশ কর্মকর্তা এসআই মো. ইকবাল হোসেনের দেওয়া জবানবন্দি পুরো আদালতকক্ষকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে আদালতকে জানান যে, ঘটনাস্থল থেকে একটি জর্জেটের ওড়না জব্দ করা হয়েছিল, যা দিয়ে শিশুটির মুখ অত্যন্ত শক্ত করে বেঁধে এই বর্বর নির্যাতন চালানো হয় যাতে তার চিৎকার বাইরে না আসে। খুনিদের শয়নকক্ষের খাটের নিচে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রামিসার রক্তাক্ত ধড় পড়ে ছিল এবং ঘরের এক কোণায় থাকা একটি পানির বালতির ভেতর থেকে তার কাটা মাথাটি উদ্ধার করা হয়। লাশ চিরতরে আড়াল করার জন্য খুনি দম্পতি শিশুটির হাত ও পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার যৌনাঙ্গও ক্ষতবিক্ষত করে। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসাদ জাবিন তার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, মরদেহের মুখে ধারালো নখের আঁচড়, দুই ঠোঁট কাটা, নাক ভাঙা এবং বুকের বাঁ পাশে তীব্র আঘাতের স্পষ্ট আলামত ছিল। মূলত অত্যন্ত ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করার কারণেই রামিসার তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে এবং ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষায় মৃত্যুর পূর্বে তাকে পাশবিক উপায়ে ধর্ষণের অকাট্য ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলেছে।

মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে খুনি দম্পতির শেষ মুহূর্তের পৈশাচিক তৎপরতার বিবরণ দেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন রামিসার মা পারভীন আক্তার প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ‘বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিছু হবে না’ বলে বারবার আকুতি ও কান্না করলেও ঘরের ভেতর থেকে খুনি দম্পতি সাড়া দেয়নি। কারণ, তারা তখন ফ্ল্যাটের কমন বাথরুমে শিশুটিকে উপর্যুপরি আঘাত করে নিস্তেজ করার পর মৃত ভেবে লাশ গুম ও মাথা কাটার খেলায় লিপ্ত ছিল। এমনকি পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা রক্তাক্ত ঘরের মেঝের সমস্ত আলামত ও আস্তরণ পানি দিয়ে ধুয়ে পুরোপুরি মুছে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সমস্ত বিজ্ঞানসম্মত ফরেনসিক তথ্য, পারিপার্শ্বিক ডিএনএ আলামত এবং আসামিদের জবানবন্দির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এই জঘন্য ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একমাত্র শাস্তি ফাঁসি। দেশবাসী আজ এই মামলার মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

RDM News 24 | ঢাকা

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ