তারেক রহমানের সুনজরে পড়তে বিএনপি নেতাদের ‘দৌড় প্রতিযোগিতা’, দলে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক
রাজনৈতিক প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, বাংলাদেশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতাদের দিয়ে যে ‘দৌড়’ শুরু হয়েছিল, তা এখন যুবদল ছাড়িয়ে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের মোটরকেডের পাশে নেতাকর্মীদের এমন রুদ্ধশ্বাস দৌড়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা, সমালোচনা ও ট্রোলিং। দলের ভেতরে অনেকেই একে ‘নেতার দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতা’ বা ‘লবিংয়ের নতুন কৌশল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর থেকে দলটির ভেতরে এক ধরণের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। মাঠে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং জামায়াতকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে না করায়, এখন দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় প্রধানের সামনে নিজেদের দৃশ্যমান করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমান ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যাতায়াতের সময় নিজের নিরাপত্তা বলয় কিছুটা শিথিল রাখার নির্দেশ দেওয়ায়, নেতাকর্মীরা তার কনভয়ের একদম কাছাকাছি যাওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না।
বইমেলা থেকে শুরু, এরপর ঢাবি ও চাঁদপুর
নেতাকর্মীদের এই দৌড় প্রতিযোগিতার প্রথম বড় ঘটনাটি ঘটে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি, যখন প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করতে বাংলা একাডেমিতে যাচ্ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর পৌঁছালে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে গাড়ির সমান্তরালে দৌড়ে স্যালুট দিতে দেখা যায়। সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে রাকিব এক পোস্টে দাবি করেন, তিনি মাত্র ‘৫-৭ সেকেন্ড’ দৌড়েছিলেন এবং গণমাধ্যম বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে।
তবে এই প্রবণতা এখানেই থেমে থাকেনি:
* *১২ মে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়):* তারেক রহমান পুনরায় ঢাবিতে এলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. আবিদুল ইসলাম খানকেও কনভয়ের পাশে দৌড়াতে দেখা যায়। পরে তিনি লাইভে এসে দাবি করেন, জ্যামের কারণে দেরি হওয়ায় তিনি মূলত দ্রুত হাঁটার জন্য দৌড়াচ্ছিলেন।
* *১৬ মে (চাঁদপুর সফর):* সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ১৬ মে প্রধানমন্ত্রীর চাঁদপুর সফরের সময়। সকাল পৌনে ৯টার দিকে গুলশান থেকে কনভয় ছাড়ার পর কাকরাইল মোড়ে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নকে প্রটোকল গাড়ির সামনে দৌড়ে স্যালুট দিতে এবং স্লোগান দিতে দেখা যায়।
* *একই দিন (টিকাটুলী):* সবচেয়ে বেশি শোরগোল ফেলে দেন খোদ সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও নবগঠিত সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে টিকাটুলী এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাসের সামনে রীতিমতো স্প্রিন্ট টানতে দেখা যায়। একজন রানিং প্রতিমন্ত্রী, যার এমনিতেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়মিত যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তার এমন আচরণে খোদ দলের সিনিয়র নেতারাই লজ্জিত বোধ করছেন।
নিরাপত্তা বনাম রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
কনভয়ের পাশে দৌড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদল সভাপতি রাকিব বলেন, “এটি কোনো সাধারণ দৌড় নয়। আমরা সবসময় স্যারের (তারেক রহমান) নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত থাকি এবং আমাদের চেয়ারম্যানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই।” তবে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF) থাকতে ছাত্রদলকে কেন নিরাপত্তা দিতে হবে, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। একই সুর শোনা গেছে স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি এস এম জিলানীর কণ্ঠেও। আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান একে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দলীয় প্রধান রাস্তায় বের হলে নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরবেই।
নেতাদের ক্ষমতার লোভ ও রাজনৈতিক উন্মাদনা
প্রকাশ্যে সিনিয়র নেতারা একে স্বাভাবিক বললেও, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক নীতিপ্রণেতা এই আচরণকে ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ এবং ‘ব্যক্তিগত লোভের বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
দলের এক শীর্ষ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জনসেবা বা আদর্শের রাজনীতি বাদ দিয়ে নেতারা এখন সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য রাজনীতিকে তামাশায় পরিণত করছেন। প্রধানমন্ত্রীর সুনজরে পড়ে পদ-পদবি বাগানোর এই নোংরা প্রতিযোগিতা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং এতে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
জাতীয় ও রাজনীতি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ