কর্পোরেট দায়বদ্ধতা: দাতব্য সেবা থেকে টেকসই ব্যবসায়িক কৌশলে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) বা প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণাটিতে এক নীরব কিন্তু বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় যা ছিল কেবল বন্যা বা দুর্যোগে সাময়িক ত্রাণ বিতরণ কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে করা অনানুষ্ঠানিক দান-খয়রাত, তা এখন আধুনিক ব্যবসা পরিচালনার একটি কাঠামোগত এবং কৌশলগত অংশ হিসেবে রূপ নিতে শুরু করেছে। তবে এই রূপান্তরকে পুরোপুরি সফল করতে জাতীয় নীতিমালা, ব্যবসায়িক কৌশল এবং সামাজিক জবাবদিহিতার মধ্যে সমন্বয় আনা এখন সময়ের দাবি।
আর্থিক খাতের বাইরে জাতীয় কাঠামোর অভাব
২০০৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সিএসআর নীতিমালা চালুর পর ব্যাংকিং খাতে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং ও সামাজিক বিনিয়োগের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি হয়। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস বা ইউনিলিভার বাংলাদেশের মতো বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী সিএসআর কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তবে ব্যাংকিং খাতের বাইরে অন্য বড় শিল্প খাতগুলোর জন্য কোনো সমন্বিত বা বাধ্যতামূলক জাতীয় সিএসআর নীতিমালা নেই। ফলে একেক প্রতিষ্ঠান নিজ ইচ্ছামতো সাময়িক বা প্রতীকী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিএসআর পরিচালনা করছে, যা এর মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
সরকারি প্রণোদনা ও শ্রমিকের অংশগ্রহণের ঘাটতি
ব্যবসায়িক মহলের মতে, সিএসআর-কে কেবল অতিরিক্ত খরচ বা ইমেজ বিল্ডিংয়ের হাতিয়ার না ভেবে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে ট্যাক্স হলিডে বা কর রেয়াত, সামাজিক প্রকল্পে কম সুদে ঋণ সুবিধা এবং কারিগরি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও উৎপাদনমুখী খাতের সিএসআর পরিকল্পনায় শ্রমিক বা ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণ না থাকায় ব্যয়ের বড় অংশই মাঠপর্যায়ের প্রকৃত প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্ক যেমন ‘ইউএন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট’ বা ‘আইএসও ২৬০০০’ সম্পর্কে দেশের অধিকাংশ মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধারণা না থাকায় সিএসআর-এর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যতের পথরেখা: টেকসই উন্নয়ন ও নীতিমালার সমন্বয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্য না কমিয়ে শুধু মুনাফা অর্জন ব্যবসার প্রকৃত সার্থকতা প্রকাশ করে না। তাই সিএসআর-কে কেবল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের উচিত একে সব প্রধান শিল্প খাতের জন্য বাধ্যতামূলক করা এবং একটি নির্দিষ্ট অংশ সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কেবল আইনি প্রয়োগ নয়, বেসরকারি খাতের মানসিকতার পরিবর্তন এবং সিএসআর তহবিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একে দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
জাতীয় ও করপোরেট ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ