অর্থনীতিবিদদের চোখে ২০২৬ বিশ্বকাপ: চ্যাম্পিয়ন হবে ফ্রান্স, সবচেয়ে বড় ‘ফ্লপ’ ব্রাজিল!
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আসর নিয়ে রয়টার্সের চাঞ্চল্যকর জরিপ; গোল্ডেন বল ও বুট জয়ের দৌড়ে শীর্ষে এমবাপ্পে, চমক দেখাতে পারে নরওয়ে।
স্পোর্টস ডেস্ক: যুদ্ধবিগ্রহ, জ্বালানি সংকট আর বিশ্বজুড়ে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির উদ্বেগের মাঝে সামষ্টিক অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ থেকে এক চিলতে স্বস্তি খুঁজছেন বিশ্বের নামী অর্থনীতিবিদরা। প্রতি চার বছর পর পর তাদের জন্য এক অভিনব সুযোগ এনে দেয় বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ফুটবল বিশ্বকাপসংক্রান্ত বিশেষ জরিপ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রয়টার্সের সর্বশেষ এক বৈশ্বিক সমীক্ষায় ১৬০ জন অর্থনীতিবিদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী ১৯ জুলাই ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স। অন্যদিকে, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার সবচেয়ে বড় ‘ফ্লপ’ বা হতাশাজনক দল হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। অর্থনীতিবিদদের রসাত্মক মন্তব্য—বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া যতটা সহজ, ফুটবলের নিখুঁত হিসাব মেলানো তার চেয়েও ঢের কঠিন।
এবারের ফুটবল মহাযজ্ঞ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ হতে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো—এই তিন দেশের যৌথ আয়োজনে এবারই প্রথম ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে, যেখানে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ১১ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ফেভারিট তালিকার শীর্ষে রয়েছে ‘লে ব্লুজ’ বা ফ্রান্স। তাদের ঠিক পেছনেই ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্পেন। এই পূর্বাভাসটি জনপ্রিয় বেটিং প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’-এর বাজির দরের সাথেও বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়, তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব আবারও ইউরোপের বুকেই ফিরবে। ফ্রান্স শিরোপা জিতলে দলটির মাস্টারমাইন্ড কোচ দিদিয়ের দেশম এক অনন্য ইতিহাস গড়বেন। ১৯৩৮ সালে ইতালির ভিত্তোরিও পোজোর পর তিনি হবেন বিশ্বের দ্বিতীয় কোনো কোচ, যিনি পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাবেন। এছাড়া একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে ১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে এবং পরবর্তীতে কোচ হিসেবে একাধিকবার বিশ্বমঞ্চের ট্রফি ছোঁয়ার বিরল কীর্তিও গড়বেন তিনি। ফ্রান্স ও স্পেনের পর শীর্ষ পাঁচের বাকি দলগুলো হলো—বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল এবং ইংল্যান্ড।
লন্ডনে অবস্থিত আরবিসি (RBC)-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি বলেন, “২০২২ সালের ফাইনালের সেই হৃদয়ভাঙা হারের পর ফরাসিরা এবার আরও শক্তিশালী হয়ে মাঠে নামছে। দলটিতে এমন বেশ কয়েকজন তারকা রয়েছেন যারা গত ফাইনাল খেলেছেন এবং এখন তারা ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন। এর সাথে যোগ হয়েছে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) তরুণ তুর্কিদের উত্থান। আর সবচেয়ে বড় কথা, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আরেকটি দুর্দান্ত মৌসুম শেষ করা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবার পূর্ণ বিশ্রামে থেকে সম্পূর্ণ সতেজ হয়ে টুর্নামেন্টে নামবেন।” জরিপ অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা (গোল্ডেন বুট)—উভয় পুরস্কারেরই প্রধান দাবিদার কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এক মৌসুমে ক্যারিয়ারসেরা ৬১ গোল করে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতা ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন। বিশ্বকাপে বর্তমানে এমবাপ্পের গোল ১২টি এবং হ্যারি কেনের ৮টি। অন্যদিকে, ১৩ গোল করা লিওনেল মেসির পাশাপাশি জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের করা অল-টাইম রেকর্ড ১৬ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার সুযোগ থাকছে এই দুই তারকার সামনেও।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ অর্থনীতিবিদ কোনো গাণিতিক মডেল নয়, বরং তাদের ‘মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি’ (Gut Feeling) থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জোহানেসবার্গের ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ শ্যানন বোল্ড রসিকতা করে বলেন, “যেকোনো অর্থনৈতিক মডেলের মতোই, ফুটবলের এই পূর্বাভাসেও আমরা মনের অনুভূতির একটি বড় ডোজ যোগ করেছি!” মাত্র ২০ শতাংশ উত্তরদাতা ডেটা এবং গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করেছেন। কিন্তু ব্রাজিলের ভাগ্যাকাশে এবার দুর্যোগের মেঘ দেখছেন তারা। কোচ হিসেবে কার্লো আনচেলত্তির আগমনও ব্রাজিলের ওপর অর্থনীতিবিদদের আস্থা বাড়াতে পারেনি। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতার মতে, ২০২২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেওয়া সেলেসাওরাই এবার ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হতাশ করবে। ব্রাজিলের পর এই তালিকায় রয়েছে ইংল্যান্ড ও জার্মানি।
তবে ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে এবার বড় চমক দেখাতে পারে বলে মনে করছেন ২১ শতাংশ অর্থনীতিবিদ। আন্ডারডগ বা ডার্ক হর্স হিসেবে নরওয়ের পরেই রয়েছে জাপান (১৫ শতাংশ)। উদীয়মান তারকা হিসেবে ৪৬ জন ফুটবলারের নাম উঠে আসলেও স্পেনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল রয়েছেন সবার শীর্ষে। আর সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’-এর লড়াইয়ে ফেভারিট হিসেবে নাম এসেছে ফ্রান্সের মাইক মাইনান, আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং স্পেনের উনাই সিমোনের। মাঠের লড়াইয়ের বাইরে আয়োজকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লজিস্টিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা। উত্তর আমেরিকায় লাখ লাখ ফুটবল ভক্তের ঢল নামার প্রস্তুতি চলছে, তবে আকাশছোঁয়া খরচ ইতিমধ্যেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিকিটের চড়া মূল্য, আবাসন সংকট এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশের বেশি অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ফুটবল বিশ্বকাপের ফলাফলের চেয়ে ২০২৬ সালের বিশ্ব মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া অনেক সহজ। তুরস্কের সেকেরব্যাংকের ওজান কান তুর্কমেন বলেন, “আমরা জানি বিশ্বকাপ কবে শেষ হবে, কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ সংকট কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না!”
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্পাদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ