ইউরোপের মাটিতে লাল-সবুজের মহাকাব্যিক ইতিহাস, সান মারিনোকে গুঁড়িয়ে স্বপ্নের জয় বাংলাদেশের
ডিফেন্ডার তপু বর্মনের জোড়া হেডে থমাস ডুলি যুগের রাজকীয় অভিষেক; সেট-পিস ও মাঝমাঠে লেস্টার সিটির হামজা চৌধুরীর বিশ্বমানের পারফরম্যান্স।
ঢাকা: বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে লিখে রাখল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। দূর ইউরোপের মাটিতে প্রথমবারের মতো পা রেখেই ফুটবল ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও মহাকাব্যিক বিজয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। ইতালি-সীমান্তঘেঁষা ইউরোপীয় ঘরানার শক্তিশালী ও শারীরিকভাবে শ্রেয়তর দল সান মারিনোকে তাদেরই ঘরের মাঠে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। গত ৫ জুন ২০২৬ রাতে সান মারিনোর স্তাদিও অলিম্পিকো দি সেরাভাল্লে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক ও রূপকথার মতো জয়ের মহানায়ক অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মন, যার মাথা থেকে আসা দুটি দর্শনীয় ও জাদুকরী গোল কোটি ফুটবলপ্রেমী বাঙালিকে উল্লাসের জোয়ারে ভাসিয়েছে। মার্কিন বংশোদ্ভূত দূরদর্শী নতুন প্রধান কোচ থমাস ডুলির অধীনে এটিই ছিল বাংলাদেশ দলের প্রথম ম্যাচ এবং একই সাথে ইউরোপীয় কোনো ফুটবল পরাশক্তির কন্ডিশনে গিয়ে সেই অঞ্চলের কোনো দেশের বিরুদ্ধে ফুটবল ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম জয়। এই জয় কেবল একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের সাধারণ জয় নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের দরবারে বাংলাদেশের ফুটবলীয় উত্থান, সক্ষমতা এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী দলিল হিসেবে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ঐতিহাসিক এই দ্বৈরথটি শুরুর আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের সমীকরণ অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৮১তম এবং সান মারিনো ২১১তম অবস্থানে থাকলেও বাস্তবতার নিরিখে ইউরোপের মাটিতে খেলাটা বাংলাদেশের জন্য ছিল এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। সান মারিনো দল নিয়মিতভাবে ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানি কিংবা স্পেনের মতো বিশ্বসেরা দলগুলোর বিপক্ষে খেলার কারণে তাদের ইউরোপীয় ঘরানার শারীরিক ফুটবল, গতি এবং ম্যাচ টেম্পারামেন্ট ছিল অত্যন্ত উচ্চমানের। সেই কঠিন কন্ডিশন ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ম্যাচ শুরুর প্রথম মিনিট থেকেই বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে স্বাগতিক সান মারিনো। তবে কোচ থমাস ডুলির সুনিপুণ ও রক্ষণাত্মক রণকৌশলে বাংলাদেশ দল প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিতে শুরু করে এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। ম্যাচের ১৯তম মিনিটে প্রথম কাঙ্ক্ষিত ও ঐতিহাসিক সাফল্য আসে লাল-সবুজ শিবিরে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বিখ্যাত ক্লাব লেস্টার সিটির তারকা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর একটি নিখুঁত, মাপা ও চোখধাঁধানো বাঁকানো ফ্রি-কিক সান মারিনোর ডি-বক্সের ভেতর খুঁজে নেয় তরুণ স্ট্রাইকার শেখ মোরশালিনকে, যিনি বাতাসে ভেসে দারুণ দক্ষতায় হেড করে বলটি গোলপোস্টের সমান্তরালে ক্রস করেন। সেখানে চিলির মতো উঁচে উঠে অত্যন্ত নিখুঁত ও বুলেটগতির হেডে সান মারিনোর জাল ভেদ করেন তপু বর্মন।
বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর স্টেডিয়ামজুড়ে উপস্থিত হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশিরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। তবে স্বাগতিক সান মারিনো পিছিয়ে পড়ে দমে যায়নি, বরং গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে অল-আউট আক্রমণ শুরু করে। তাদের তীব্র শারীরিক চাপ ও দলগত সংহতির মুখে ম্যাচের ৩১তম মিনিটে সান মারিনোকে সমতায় ফেরান তাদের তারকা ফরোয়ার্ড নিকোলাস জিয়াকোপেত্তি। মাঝমাঠের একটি রক্ষণাত্মক ভুল থেকে বল পেয়ে অত্যন্ত কাছ থেকে নেওয়া তার জোরালো শটটি বাংলাদেশের গোলকিপার মিতুল মারমার হাত ছুঁয়ে জালে জড়ালে পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। প্রথমার্ধের বাকি সময়ে দুই দলই লিড নেওয়ার চেষ্টা করে এবং বিরতির ঠিক আগে বাংলাদেশের সাদ উদ্দিন মোরশালিনের পাস থেকে গোলকিপারকে একা পেয়েও গোল করার একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে প্রথমার্ধ ১-১ সমতায় শেষ হয়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের গতি বাড়াতে, প্রতিপক্ষের শারীরিক ফুটবলের জবাব দিতে এবং মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের করে নিতে কোচ থমাস ডুলি অত্যন্ত সাহসী, দূরদর্শী ও কৌশলী ট্রিপল পরিবর্তন আনেন। তিনি একই সাথে মাঠে নামান অভিজ্ঞ শামিত শোম, জায়ান আহমেদ এবং গতিশীল সোহেল রানা জুনিয়রকে, যা লাল-সবুজ শিবিরের আক্রমণের ধার ও গতি প্রথমার্ধের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের একটি দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট সাইড পোস্টে লেগে ফিরে আসলে দুর্ভাগ্যবশত নিশ্চিত গোলবঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।
ম্যাচ যখন ১-১ সমতায় শেষের দিকে এগোচ্ছিল এবং সবাই যখন ড্রয়ের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত, জাদুকরী ও স্বপ্নের ক্ষণ। আবারও হামজা চৌধুরীর ডান দিক থেকে নেওয়া একটি দুর্দান্ত ও নিখুঁত ফ্রি-কিক সান মারিনোর ডি-বক্সের ভেতর তীব্র জটলা ও বিভ্রান্তি তৈরি করে, যেখানে বিশ্বনাথ ঘোষের একটি বুদ্ধিদীপ্ত ভলি মাটিতে ড্রপ খেয়ে ওপরে উঠলে ডিফেন্ডার তপু বর্মন পুনরায় দুর্দান্ত এক ডাইভিং হেডে বল প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এবং রেফারি প্রদত্ত অতিরিক্ত চার মিনিটে সান মারিনো সমতায় ফিরতে তাদের গোলকিপারসহ সবাইকে নিয়ে আক্রমণে নামলেও বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা পাথরের মতো শক্ত রক্ষণব্যূহ তৈরি করে সব আক্রমণ প্রতিহত করে রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স রেটিংয়ে জোড়া গোল করা তপু বর্মন সর্বোচ্চ ৭.৫ রেটিং পেয়ে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন এবং ফাহিম ৭.২, মোরশালিন ৭.০ ও মোহাম্মদ ইসলাম ৬.৫ রেটিং পেয়ে কোচের আস্থার প্রতিদান দেন, যেখানে গোলকিপার মিতুল মারমা পান ৬.৩ রেটিং।
এই ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা পালন করেছেন লেস্টার সিটির রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী, যিনি মাঝমাঠে দলের ট্রানজিশন, পাসিং লাইনে বাধা দেওয়া এবং সেট-পিস নিয়ন্ত্রণে অনন্য সাধারণ বিশ্বমানের পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। ম্যাচের দুটি গোলই এসেছে তার চমৎকার ও পরিকল্পিত ফ্রি-কিক থেকে, যা নির্দেশ করে সংক্ষিপ্ত সময়ে সেট-পিস নিয়ে কোচের সুচিন্তিত হোমওয়ার্ক কতটা নিখুঁত ছিল। অভিষেক ম্যাচের আগে হামজা তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, দেশের জার্সি গায়ে জামাল ভূঁইয়া এবং দলের অন্যান্য সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলতে পারাটা তার ক্যারিয়ারের এক ভিন্ন ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এবং দলের জয়ের জন্য তিনি যেকোনো কঠিন কন্ডিশনে নিজের সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত। মাঠে খেলোয়াড়দের এই মরণপণ লড়াইকে গ্যালারি থেকে সঞ্জীবনী শক্তি জুগিয়েছেন ইতালির রোম, মিলান, ভেনিসসহ বিভিন্ন দূরবর্তী শহর থেকে তীব্র ফুটবল উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে ছুটে আসা হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি। স্তাদিও অলিম্পিকো দি সেরাভাল্লে স্টেডিয়ামের গ্যালারি প্রবাসীদের লাল-সবুজ পতাকা, ব্যানার আর গগনবিদারী ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগানে পুরো ৯০ মিনিট মুখরিত ছিল, যা দূর ইউরোপের বুকেও ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের চিরচেনা ও আবেগঘন আবহ তৈরি করেছিল।
ফুটবলীয় বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বোদ্ধাদের মতে, এই জয়কে কোনোভাবেই হালকা বা সাধারণ প্রীতি ম্যাচের জয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ ইউরোপের কন্ডিশনে গিয়ে তাদেরই ঘরের মাঠে কোনো দলকে হারানো যেকোনো এশিয়ান দেশের জন্যই অত্যন্ত কঠিন কাজ। থমাস ডুলির আধুনিক দূরদর্শী কোচিং, হামজা চৌধুরীর মতো বিশ্বমানের ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি এবং তরুণ তুর্কিদের অদম্য আত্মবিশ্বাসের এই ত্রিবেণী সংগম দেশের ফুটবল অনুরাগীদের মনে এক নতুন যুগের আশার আলো সঞ্চার করেছে। এই ঐতিহাসিক বিজয় প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের সমন্বয় ঘটানো গেলে বাংলাদেশ ফুটবলও আন্তর্জাতিক স্তরে বড় সাফল্য পেতে পারে। ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন, এই স্বপ্নের জয় থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাস ও শক্তিকে পুঁজি করে বাংলাদেশ দল আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে এশিয়ান অঞ্চলের পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন এক শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে পারবে এবং দেশের ফুটবলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
ক্রীড়া প্রতিবেদক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ