স্মার্টফোন আসক্তি: অবচেতন স্ক্রোলিংয়ে বিপন্ন মানসিক স্বাস্থ্য
উদ্দেশ্যহীন স্ক্রোলিংয়ে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়; ঢাকা ও বৈশ্বিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য।
ঢাকা: শুরুটা হয় খুব সাধারণ একটি উদ্যোগে। ফোনের কোনো জরুরি মেসেজ চেক করা, ঝটপট আবহাওয়া দেখে নেওয়া কিংবা স্রেফ একটি নোটিফিকেশনের উত্তর দেওয়া। কিন্তু এর পরের মুহূর্তেই দেখা যায়, কখন যেন একটি ঘণ্টা পার হয়ে গেছে হরেক রকম ভিডিও, পোস্ট আর অফুরন্ত স্ক্রোলিংয়ের গোলকধাঁধায়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি এখন আর কোনো আকস্মিক ভুল নয়, বরং একটি নিয়মিত ও অবচেতন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে আখ্যা দিচ্ছেন ‘অটোপাইলট স্ক্রোলিং’ হিসেবে।
সাম্প্রতিক সময়ের এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দৈনিক স্ক্রিন টাইমের (ফোনের পর্দায় কাটানো সময়) একটি বড় অংশই সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্দেশ্যহীন। মানুষ নিজেই স্বীকার করছে যে, তাদের ফোন ব্যবহারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সময়ের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে না; এটি স্রেফ অভ্যাসের বশে করা হয়। গবেষকদের মতে, এটি কেবল মানুষের দুর্বল আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির এমন এক চতুর মনস্তাত্ত্বিক ডিজাইন, যা ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনে যত বেশি সম্ভব আটকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কেมব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এলিয়েনর ড্রেজ এ প্রসঙ্গে যুক্তি দেখান যে, সমস্যাটি ব্যক্তির সাধারণ পছন্দের চেয়েও অনেক গভীর। স্মার্টফোন এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের নিমজ্জিত করার ক্ষমতা আমাদের ফোন থেকে দূরে থাকার ক্ষমতাকে সক্রিয়ভাবে বাধাগ্রস্ত করে। তবে এই ক্ষতিকর অভ্যাসটি নিজের মধ্যে চিহ্নিত করতে পারাটাই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রথম শক্তিশালী পদক্ষেপ হতে পারে।
‘এজ অব অটোপাইলট’ শিরোনামের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৬,০০০ মানুষের ওপর পরিচালিত তিনটি বড় জরিপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ‘ভার্জিন মিডিয়া ওটু’ দ্বারা পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে প্রাপ্তবয়স্করা প্রতিদিন গড়ে চার ঘণ্টা ফোনে কাটান, যার মধ্যে ৩৬ শতাংশ সময় কাটে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীনভাবে। অনেক অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, স্ক্রিন টাইম সীমিত করার বিভিন্ন ডিজিটাল টুল সম্পর্কে তারা অবগত থাকলেও, নিয়মিত সেগুলো ব্যবহার করার মতো মানসিক ইচ্ছাশক্তি বজায় রাখতে তারা হিমশিম খান।
একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশেও। একটি ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং গ্রুপের জরিপ অনুযায়ী, দেশের শহরাঞ্চলের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা তাদের ডিভাইসে ব্যয় করেন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই ‘উদ্দেশ্যহীন’ ফোন ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি।
শুধুঢাকার কথাই যদি ধরা হয়, তবে ৭০ শতাংশেরও বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে তারা দিনে অন্তত একবার স্ক্রোল করতে করতে সময়ের হিসাব পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। এর চেয়েও মারাত্মক তথ্য হলো, প্রায় অর্ধেক ব্যবহারকারী স্বীকার করেছেন যে দীর্ঘ সময় এভাবে স্ক্রিন স্ক্রোল করার পর তারা মানসিকভাবে স্বস্তি পাওয়ার বদলে আরও বেশি ক্লান্ত, বিরক্ত ও হতাশ বোধ করেন।
স্মার্টফোনের এই অভ্যাসগত ব্যবহার মানুষের মনের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বিতর্ক জোরালো হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্দেশ্যহীন ফোন ব্যবহার মানুষকে এক ধরনের তীব্র অসন্তোষের দিকে ঠেলে দেয় এবং অনেক সময় ব্যবহারকারী ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে চলে আসেন। যারা স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়া ফোনে বেশি সময় কাটান, তাদের মানসিক বা আবেগীয় স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার ঝুঁকি অনেক বেশি।
তবে ব্যবহারকারীদের নিজেদের দেওয়া স্ক্রিন টাইমের তথ্যের শতভাগ নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন বাথ স্পা ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি অ্যান্ড সায়েন্স কমিউনিকেশনের অধ্যাপক পিট এচেলস। তিনি বলেন, প্রযুক্তির পেছনে মানুষ ঠিক কতটা সময় ব্যয় করছে, তা অনুমানের ক্ষেত্রে তারা সাধারণত ভুল করে থাকেন। বাস্তব তথ্যের সঙ্গে ব্যবহারকারীদের অনুমানের তুলনা করে দেখা গেছে, মানুষ প্রায়শই তাদের স্ক্রিন টাইম বাড়িয়ে বলে।
তা সত্ত্বেও এচেলস মনে করেন, এই গবেষণার মূল বার্তাটি অত্যন্ত মূল্যবান। স্ক্রিন টাইম নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়; সমস্যাটি তখন তৈরি হয় যখন এটি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের দিকে নিয়ে যায়—যেমন গাড়ি চালানোর সময় নোটিফিকেশন চেক করা কিংবা ঘুমের সময় নষ্ট করে গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা।
রিডিং ইউনিভার্সিটির নেটা ওয়েনস্টাইন এই পুরো বিষয়টিকে কিছুটা সহানুভূতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, উদ্দেশ্যহীন স্ক্রোলিং কখনো কখনো মানুষকে বিনোদন, মানসিক আরাম বা সাময়িক সামাজিক যোগাযোগের অনুভূতি দিতে পারে। আসল প্রশ্নটি হলো—স্মার্টফোনে স্ক্রোলিং শেষে আমরা কি আসলেই মানসিকভাবে চাঙ্গা বোধ করছি, নাকি আমাদের মানসিক অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হচ্ছে?
বর্তমানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাপ ডিজাইনের দিকেও আঙুল তুলছেন সমালোচকেরা। বিশেষ করে ফোনের পুশ নোটিফিকেশনগুলো, যা সাধারণত ‘বাই ডিফল্ট’ অন করা থাকে। সমালোচকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়, বরং ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে তাদের অ্যাপে সক্রিয় রাখাকেই বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ থেকে বাঁচতে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশনগুলো বন্ধ রাখা, স্ক্রিন টাইম ট্র্যাকার ব্যবহার করা কিংবা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ‘ফোন-মুক্ত’ থাকার মতো সহজ পদক্ষেপগুলো বেশ কার্যকর হতে পারে।
ড. ড্রেজের মতে, লক্ষ্য স্মার্টফোন পুরোপুরি বর্জন করা নয়, বরং এর ব্যবহারকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা। তিনি বলেন, আমাদের ডিভাইসগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী টুল—এগুলো এক একটি মিনি সুপারকম্পিউটার, যা অত্যন্ত দরকারী এবং আনন্দদায়ক। মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত থাকা যা ইতিবাচক এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ।
বাংলাদেশে স্মার্টফোনের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যেখানে বর্তমানে দেশজুড়ে ১২ কোটিরও বেশি মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং বা ডিজিটাল কল্যাণের আলোচনাটি আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠবে। একটু থমকে দাঁড়ানো, নিজের স্ক্রিন টাইম খেয়াল করা এবং স্ক্রিনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে এই ‘অটোপাইলট’ জীবন থেকে মুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ফিচার ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ