মোবাইল খাতে কর কমলে জিডিপি ও রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে: গবেষণা
অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিবেদক, RDM News 24
ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬: বাংলাদেশের মোবাইল কানেক্টিভিটি বা টেলিযোগাযোগ খাতে কর সংস্কার করা হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে। এর মাধ্যমে আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) মার্কিন ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করা সম্ভব। ইউরোপভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রন্টিয়ার ইকোনমিক্স লিমিটেড’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটির বাধা দূর করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি চলতি মে ২০২৬-এ প্রকাশ করা হয়। গ্লোবাল ডিজিটাল অপারেটর ‘ভিওন’ (VEON)-এর জন্য তৈরি এই প্রতিবেদনে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, মোবাইল খাতের ওপর থেকে অতিরিক্ত করের বোঝা কমালে তা ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে এবং সামগ্রিক করের আওতা সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে দেশে মাথাপিছু জিডিপির বার্ষিক প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার বর্তমানের অনুমিত ৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এই সংস্কারের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে মোবাইল ও ইন্টারনেটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে দেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ৫ শতাংশ এবং গ্রাহকপ্রতি গড় ডেটা বা ইন্টারনেট ব্যবহার ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটালাইজেশন দেশের অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে সাহায্য করে এবং কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মোট কর রাজস্বকে জিডিপির ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে স্মার্টফোন রয়েছে, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
টেলিযোগাযোগ খাতে বৈষম্যমূলক করের বোঝা
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মোবাইল খাতের ওপর করের বোঝা অন্যতম সর্বোচ্চ। অপারেটরদের মোট আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশই বিভিন্ন কর, শুল্ক ও ফি হিসেবে সরকারি কোষাগারে চলে যায়। বর্তমান কর কাঠামোর মধ্যে রয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১ শতাংশ সারচার্জ এবং এছাড়া রয়েছে রেভিনিউ শেয়ারিং ও সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডের বাধ্যবাধকতা।
পাশাপাশি, নতুন সিম সংযোগের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকা ট্যাক্স নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় বাধা। মোবাইল অপারেটরদের ওপর আরোপিত করপোরেট করের হার (৪০% থেকে ৪৫%), যা দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক খাতের (২২.৫% থেকে ২৭.৫%) চেয়ে অনেক বেশি।
প্রস্তাবিত কর সংস্কার ও রাজস্বের ভবিষ্যৎ
ফ্রন্টিয়ার ইকোনমিক্স তাদের মডেলে কর কাঠামো ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্পূরক শুল্ক ও রেভিনিউ শেয়ারিং চার্জ কমিয়ে সম্মিলিত বিক্রয় ও টার্নওভার কর ২৩ শতাংশে নামিয়ে আনা, ৩০০ টাকার সিম ট্যাক্স সম্পূর্ণ বিলোপ করা এবং মোবাইল অপারেটরদের করপোরেট করের হার ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে, এই সংস্কারের ফলে শুরুতে সরকারের রাজস্ব কিছুটা কমবে। যেমন—২০২৭ সালে খাতটি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় ৭৬১ মিলিয়ন ডলার (২.৫%) হ্রাস পেতে পারে। তবে এই ক্ষতিকে সাময়িক ট্রানজিশন পিরিয়ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উন্নত কানেক্টিভিটির কারণে অর্থনীতিতে যে গতি আসবে, তা এই ঘাটতি পূরণ করে ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারকে একটি লাভজনক অবস্থানে (Fiscal Break-even) নিয়ে যাবে। পরবর্তীতে ২০৩৪ সালের মধ্যে এই খাত থেকে বর্তমান ধারার চেয়ে বার্ষিক প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত নিট রাজস্ব অর্জিত হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১-এর লক্ষ্য অর্জনে এই খাতভিত্তিক কর পুনর্বিন্যাস করা এবং প্রাথমিক বছরের সাময়িক রাজস্ব ক্ষতি সামাল দিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা’ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ