আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহকে ‘আইনি স্বীকৃতি’ দিচ্ছে তালেবান: উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে

admin

May 23, 2026

আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহকে ‘আইনি স্বীকৃতি’ দিচ্ছে তালেবান: উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, RDM News 24
আফগানিস্তান: আফগানিস্তানে তালেবান সরকার নতুন একটি আইন বা ডিক্রির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাল্যবিবাহকে কার্যত আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। লন্ডনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নতুন এই আইন আফগান নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকারকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, এই আইন বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সংকুচিত করেছে যা ভুক্তভোগী নারীদের স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিচ্ছেদ চাওয়ার পথ প্রায় বন্ধ করে দিচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্যমতে, এটি আফগানিস্তানে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা’।

নতুন আইনের নেতিবাচক প্রভাব
গত সপ্তাহে অনুমোদিত নতুন বিবাহবিচ্ছেদ আইনে বেশ কিছু কঠোর ও বৈষম্যমূলক বিধান রাখা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা:
* *বিচ্ছেদে স্বামীর আপত্তি:* কোনো নারী যদি বিয়ের পর দাবি করেন যে তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবে স্বামী আপত্তি জানালে তিনি আর বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারবেন না।
* *আর্থিক সহায়তা ও বিচ্ছেদ:* স্বামীর অনুপস্থিতি বা আর্থিক সহায়তা না দেওয়াকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখিয়ে কোনো নারী বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন না।
* *প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা:* এই আইনের মাধ্যমে কার্যত বাল্যবিবাহকে একটি বৈধ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে, যা আগে থেকে চলমান জোরপূর্বক বিয়ের প্রবণতাকে আরও উসকে দেবে।

পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বেসরকারি তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তালেবান সরকার মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর প্রায় ৭০ শতাংশ কন্যাশিশুকে অল্প বয়সে বা জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ বিয়ের ক্ষেত্রে কনের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে।

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন (UNAMA) এই আইনটির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তা জর্জেট গ্যাগনন বলেছেন, “এই ডিক্রি আফগান নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার ক্ষয়ের আরেকটি ধাপ এবং এটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।”

মানবাধিকারকর্মী ফাতিমা অভিযোগ করে বলেন, “নারীবিরোধী শত শত নির্দেশ জারির পর এখন তালেবান আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর মধ্যেই বাল্যবিবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে। তারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে মানুষের স্বাধীনতা দমনে ব্যস্ত।”

তালেবানের অবস্থান
সব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জানান, তারা এসব প্রতিবাদকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তালেবান নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশনে তিনি বলেন, “যারা ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী ব্যবস্থার বিরোধী, তাদের প্রতিবাদে আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়।”

ভুক্তভোগীদের করুণ বাস্তবতা
আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বাল্যবিবাহের ফলে যে ধরনের গৃহস্থালি সহিংসতা ও মানসিক যন্ত্রণা বাড়ছে, তা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি মাসের শুরুতে মধ্য আফগানিস্তানের দায়কুন্দি প্রদেশে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয় তার স্বামীর নির্যাতনে। আট মাস আগে বিয়ে হওয়া ওই কিশোরী বিয়ের দুই মাস পর থেকেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। স্থানীয় প্রবীণরা তাকে সংসার করতে বাধ্য করলেও শেষ পর্যন্ত অকাল মৃত্যুর শিকার হতে হয়েছে তাকে।

আফগানিস্তান ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের আবদুল আহাদ ফারজাম মনে করেন, তালেবানের এই নতুন আইন পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করছে এবং নারীদের আইনের দৃষ্টিতে অসম অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি আফগান নারীদের জন্য অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আসছে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ