বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বললেন ভারতের প্রধান বিচারপতি, ক্ষোভে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন
আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক রিলেশনসে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা ৩০ বছর বয়সী ভারতীয় যুবক অভিজিৎ দীপক গত ৭২ ঘণ্টায় কার্যত চোখের পাতা এক করতে পারেননি। নেহাতই ক্ষোভ আর হতাশা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা তার একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট যে ভারতের রাজনীতিতে এমন ঝড় তুলবে, তা তিনি নিজেও ভাবেননি। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কর্তৃক বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে সম্বোধন করার প্রতিবাদে অভিজিতের খোলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন দেশটির লাখ লাখ যুবকের আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার একটি উন্মুক্ত শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি বলেন, “তেলাপোকার মতো কিছু তরুণ আছে, যাদের কোনো চাকরি বা পেশাদারি জগতে স্থান নেই। তারা কেউ মিডিয়া, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া, আবার কেউ আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করছে।” যদিও পরে তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, মন্তব্যটি তিনি সাধারণ তরুণদের উদ্দেশ্য করে করেননি, বরং ভুয়া ডিগ্রিধারীদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন। তবে ভারতের ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের ১২ বছরের তীব্র বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং সম্প্রতি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) মাঝে এই মন্তব্য ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
এই চরম অবমাননার প্রতিবাদে গত শনিবার অভিজিৎ দীপক তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, “সব তেলাপোকা যদি একজোট হয়, তবে কেমন হবে?” এরপরই তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল এবং ওয়েবসাইট তৈরি করেন। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এই দলটির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ গুগল ফর্ম পূরণ করে সদস্যপদ নিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্যঙ্গাত্মক দলে পশ্চিমবঙ্গের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র, বিহারের সাবেক এমপি কীর্তি আজাদ এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলা আশিস জোশীর মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বরাও নাম লিখিয়েছেন।
আমেরিকার শিকাগো থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ বলেন, “ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা সাধারণ নাগরিকদের তেলাপোকা ভাবছেন। কিন্তু তাদের জানা উচিত, স্যাঁতসেঁতে ও পচা জায়গাতেই আরশোলার জন্ম হয়। বর্তমান ভারতের শাসনব্যবস্থাও ঠিক তেমন হয়ে গেছে।” প্রখ্যাত আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “বিচারপতির এই মন্তব্যে যুবসমাজের প্রতি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার চরম কুসংস্কার ও বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। আম্বানি-আদানির মতো পুঁজিবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দেশের যুবসমাজ আজ রক্তক্ষরণের শিকার।”
নিছক রসিকতা ও ব্যঙ্গ দিয়ে শুরু হলেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন ভারতের তরুণদের অধিকার আদায়ের এক প্রতীকী বিকল্প প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। দলটির ইশতেহারে অলস, বেকার ও ধর্মনিরপেক্ষ তরুণদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা ভারতের বর্তমান গতানুগতিক ও একনায়কতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ