ভুয়া রপ্তানি আদেশে প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

admin

May 13, 2026

ভুয়া রপ্তানি আদেশে প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

ভুয়া রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংঘটিত এই অনিয়মে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগসাজশ ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ২৯টি গ্রাহক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত রপ্তানির তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মূল্যের রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকৃত রপ্তানি মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এলসি খোলার সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ৩৮০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত এলসি খোলা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে আমদানিকৃত কাঁচামাল রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, টোটাল ফ্যাশন, অবন্তী কালার টেক্স, ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেল, অহনা নিট কম্পোজিট ও এইচ কে অ্যাপারেলসসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত রপ্তানির তুলনায় অস্বাভাবিক পরিমাণ এলসি খুলেছে। উদাহরণ হিসেবে, টোটাল ফ্যাশনের প্রকৃত রপ্তানি ছিল ৬২ মিলিয়ন ডলার, অথচ প্রতিষ্ঠানটি ২৩১ মিলিয়ন ডলারের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা বছরের পর বছর যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব লেনদেন অনুমোদন করেছে এবং কোনো তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানায়নি। একই ব্যবসায়িক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এলসি ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এই অনিয়মের সময় শাখাটির ব্যবস্থাপক ছিলেন মো. শহিদ হাসান মল্লিক। তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা ভঙ্গ করে তিনি টানা ১০ বছর একই শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আরও ২৪ জন কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে কর্মরত ছিলেন।

যদিও তদন্ত প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালেই সম্পন্ন হয়েছিল, তবে ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘ তিন বছর সময় লেগেছে। চলতি বছরের মার্চে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার অথরাইজড ডিলার (এডি) লাইসেন্স বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তৎকালীন প্রভাবশালী পরিচালনা পর্ষদের কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ জানিয়েছেন, ব্যাংকটিতে বর্তমানে ফরেনসিক অডিট চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে জানানো হয়েছে এবং মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এডি লাইসেন্স বাতিল করাই যথেষ্ট নয়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা, পরিচালনা পর্ষদ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে ট্রেড ফাইন্যান্সের নামে সংঘটিত বড় ধরনের অনিয়মের এটি একটি অন্যতম উদাহরণ।

অর্থনীতি ডেস্ক | RDM News 24 | ঢাকা, বাংলাদেশ

 

Leave a Comment

হোম
নতুন খবর
খবর
যোগাযোগ